নক্ষত্রের গোধূলি-[১২৫]-১১৮

২৪৫।
তার প্রথম জীবনে নিজের জন্মদাত্রী মা এবং বাবা কিংবা ভাইবোন কেওই তাকে আপন করে নিতে পারেনি। তখন তো তবুও বছরে একবার দেশে গেছে, যাবার সময় সবার জন্য যার যা প্রয়োজন, যার যা বায়না ছিল সবই নিয়ে গেছে,
দেশে গিয়েও মায়ের সংসারে যা প্রয়োজন সব কিনে দিয়েছে। নগদ যা উপার্জন করেছে তা নির্দ্বিধায় বাবার হাতে তুলে দিয়েছে। এখনও বাড়ির চারিদিকে তাকালে যা যা দেখা যায় তার সবই প্রায় তার নিজের কেনাতবুও মাঝখানে একটা অদৃশ্য দেয়াল দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। প্রথম যেদিন বাড়ি ছেড়ে এসেছিল সেদিন ঘুনাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেনি এই তার শেষ আসা। সে তাদের কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথির মতই আচরণ পেয়েছে। এমনকি তারা কেও কোনদিন সংসারে তার অবদান স্বীকার করেনি বা ভালমন্দ কোন মতামতের মূল্যায়ন করেনি, তার মান অভিমানের কিছুই বুঝতে চায়নি। খুবই অল্প বয়সে সে পৃথিবীর কাঠিন্য এবং জটিলতা খুব কাছে থেকে দেখতে পেয়েছে অনুভব করেছে বাস্তবের কষাঘাত। যা কেও তাকে শিখিয়ে দেয়নি জীবনে চলা পথের কাছেই বুঝতে শিখেছে।
এবার তার স্ত্রী সন্তানেরাও যদি তেমন করে তাহলে? একটা অজানা আতংকের মেঘে ছেয়ে গেল তার মনের আকাশ। তার সারাটা জীবন কি এমনি করেই যাবে? এমনি নানা চিন্তা ভাবনায় অস্থির। কিছুই করতে ইচ্ছে করে না। খাবারেও কোন ইচ্ছে নেই। রাতে ঘুম হলো না। সারা রাত ব্যালকনির ওই চেয়ারে বসে সাগরের দিকে চেয়ে চেয়ে কাটিয়েছে আর শুধু বিড়ি টেনেছে। মনে হচ্ছিল বিড়ির ধোয়া তার মনের সমস্ত আতংক হতাশা, সমস্ত কালিমা ধুয়ে নিয়ে যাবে কিন্তু তা পারেনিসকালে উঠে ফ্রেশ হয়ে টেবিল থেকে ফোন কার্ডটা হাতে নিয়ে ফোনের কাছে আসলেন বাড়িতে ফোন করবে কিন্তু রিসিভার হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ ভেবে আবার রেখে দিলেনফোন করা হলো না। কি হবে ফোন করে? সে দেশে ফিরে যাচ্ছে, এটা কি কোন সুখবর, যে ঘটা করে জানাতে হবে? নিঃস্ব রাশেদ সাহেবের দেশে ফেরার সংবাদ কার কাছে সুখবর হতে পারে? অন্তত সে নিজে এটাকে কিছুতেই কোন সুখবর বলে মনে করতে পারছেন না। সারাদিন বাসে করে এদিক অদিক ঘুরে কাটালেন কিন্তু কোথাও স্বস্তি না পেয়ে আবার বাসায় ফিরে আসলেন

পরেররাতেওএকইভাবেসাগরের দিকে তাকিয়ে থেকে সারা রাত কাটিয়ে নানা চিন্তাভাবনার জগতে ঘুরে ঘুরে শ্রান্ত ক্লান্ত রাশেদ সাহেব শেষ রাতের দিকে চেয়ারে হেলান দিয়ে একটুখানি ঝিমিয়ে পড়েছিলেনসকালে আহাদ উঠে ওকে সোফায় না দেখে এবং বাথরুমেও কোন শব্দ না পেয়ে ব্যালকনিতে এসে দেখে ঘুমাচ্ছে। ডাকল
-রাশেদ, তুমি এখানে ঘুমচ্ছ কেন, বেডে গেলেই পারতে
-না, সাগর দেখছিলাম কখন ঘুমিয়ে পড়েছি বুঝতে পারিনি
-চল, নাশতা খেয়ে বের হই!
-আহাদ কিছু মনে করো না আমি আর যেতে চাই না।
-কেন?
-না এমনিই, অনেক দিন তো হলো এবার যাবার আগে কয়েকটা দিন একটু বিশ্রাম নেই
-ও, আচ্ছা তাহলে তুমি থাক আমি চলি
-না, চল এক সাথে নাশতা খেয়ে নেই
-চল।
খাবার টেবিলে এসে আহাদ বললো-
-ঠিক আছে কাজে না গেলে, ওখানে কাজের চাপও তেমন নেই, তুমি না গেলেও হবে তার চেয়ে কিছু শপিং করে নাও
-না না কিছুই শপিং করার নেই তার চেয়ে নগদ যা আছে তোমার কাছে তাই নিয়ে গেলেই ভাল হবে


২৪৬।
এখান থেকে কতকিছুই কিনে নিতে ইচ্ছে করে কত কি ভেবে রেখেছিলেন, বীথী যূথীর জন্যে এটা নিবে ওটা নিবে অথচ রাতে ভেবে দেখেছে্ন দেশে গেলে এগুলা কোন কাজেই আসবে না। হয়ত মেয়েদের একটু ভাল লাগবে কিন্তু সে ভালোলাগা কতক্ষণ স্থায়ী হবে? দুই দিন পরেই যখন মায়ের গলা শোনা যাবে ঘরে চাল নেই যাও না এক বস্তা চাউল নিয়ে এসো তখন কেমন হবে? তার চেয়ে নগদ কিছু ডলার নিয়ে গেলে অনেক কাজে আসবে। এখানেও অন্যসব শ্রমিকেরা যা পায় রাশেদ সাহেব কি আর তাই পায়? তার পায়ের তলায় যে মাটি নেই! কাজেই আহাদ যা দেয় চোখ বন্ধ করেই তাই পকেটে ভরে রাখে। কোন দিন গুনেও দেখার দরকার মনে করেনি। এখানে থাকতে দিয়েছে, খেতে দিচ্ছে আবার একটা চাকরিও দিয়েছে সেখান থেকে যাই দেয় তা আবার গুনে দেখার কি আছে?
আহাদের কাছে থেকে টাকাটা নিয়েই ওকে সাথে নিয়ে ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন বা মানি গ্রামের অফিসে যেয়ে নিজের জন্য কিছু রেখে বাকিটা মনির নামে পাঠিয়ে দিয়ে এসে, SMS করে মনিকে জানিয়ে দিয়েছে। বাড়িতে অনেক খরচ, দুই মেয়ের পড়াশুনা, যাতায়াত চিকিৎসা এমনি অনেক। অহরহ মেহমান লেগেই আছে। এত খরচ মনি কোথা থেকে যোগার করবে?

যে কয়দিন ছিল শুধু সে চলে যাবার পর আহাদের যাতে রান্না করতে না হয় তাই অনেক কিছু রান্না করে প্লাস্টিকের প্যাকেটে ভরে ফ্রিজে রেখে দিয়েছে। বাংলা দেশের বিরিয়ানি, কোর্মা, রেজালা, মাংস খিচুরি, কলিজা ভুনা, কোপ্তা এমনি সব। আহাদ কোপ্তা খুব পছন্দ করে আসলে ইজিপশিয়ানরা কাবাব এবং ভাজা খাবার খুব পছন্দ করে। রান্না সেরে সেই ব্যালকনির চেয়ার কিংবা হেঁটে ওই সাগর পাড়। এভাবেই কয়েকটা দিন কেটে যাবার পর যাবার আগের রাতে শুয়ে শুয়ে চিন্তা করে দেখলন খুকুকে বিয়ের সময় রাজীব হিরার আংটি দিয়েছিল। ওদের কোথায় কি হবে না হবে চিন্তা করে দেখলেন হিরার দেশ থেকে যাচ্ছে অন্তত দুইজনের জন্য তার সামর্থের মধ্যে কানের দুই জোড়া হিরার রিং নিয়ে যাই খরচ যা হয় হোক। এখানে তো আর আসা হবে না! তাই ভেবে বিকেলে ফ্লি মার্কেট এবং চার্চ মার্কেটে ঘুরে ঘুরে অনেকক্ষণ ধরে দেখে দুই জোরা রিং কিনে এনে আহাদকে দেখিয়ে সাবধানে নিজের হাতব্যাগে রেখে দিলেন আহাদ হিসেব করে যা দিয়েছে তা ডলারে চেঞ্জ করে নিয়েছেনকয়েকটা রেন্ড মাত্র সাথে আছে।
[চলবে]

No comments:

Post a Comment

Follow by Email

Back to Top