নক্ষত্রের গোধূলি-[১২৫]-১২০

২৪৯।
ঢাকা নেমে খুব সহজেই ইমিগ্রেশন পার হতে পারলেন না। কিছু টাকা কড়ির আশায় ইমিগ্রেশন অফিসারের নানা অবান্তর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হলো। সাউথ আফ্রিকার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে অনেক আগে আপনি এতদিন পরে
কেন আসলেন? কেন ভিসা রিনিউ করলেন না?

দেখেন আমি যে এদেশের মানুষ তাতে কোন সন্দেহ নেই ইউকে বাংলাদেশি হাই কমিশন থেকে আমার এই পাসপোর্ট ইস্যু করেছে এবং এটার মেয়াদ এখনও আছে কাজেই দেখা যাচ্ছে আইনত আমি এ দেশের নাগরিক কাজেই আমাকে ঢুকতে না দেয়ার কোন কারণই আপনি পাচ্ছেন না আর সাউথ আফ্রিকার ভিসার বিষয়টা দেখার আপনার কোন এখতিয়ার নেই। আপনি জানেন না ভিসা ছাড়া এদেশের মানুষ কেন বিদেশে থাকে? যদি আপনি মনে করেন আমাকে ঢুকতে দিবেন না তাহলে আপনার যা ইচ্ছা তাই করেন তবে আমি এজন্যে কাওকে একটা পেনিও দিব না।
শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে এরাইভ্যাল সিল লাগিয়ে পাসপোর্ট দিয়ে দিল। ওখান থেকে ছাড়া পেয়ে সোজা কাস্টমের কাছে। তার কোন লাগেজ নেই বলে লাগেজ কালেকশনের ঝামেলাও নেই। কাস্টম অফিসার শুধু জিজ্ঞেস করল -আর লাগেজ কোথায়?
-আর কিছু নেই
-বলেন কি! কোথা থেকে আসছেন? কতদিন পরে আসছেন?
-এখন আসছি ডারবান থেকে তবে সর্বমোট প্রায় দশ বছর পর আসছি। আর কিছু বলবেন?
ব্যাগটা একটু দেখে রাশেদ সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, না ঠিক আছে, যান
কথা বলার সময়েই কাঁচের দেয়ালের ওপাশে মাঝুকে দেখেছে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। টেবিলের উপরে নামানো ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে বের হয়ে আসতেই মাঝু বাবাকে বুকে আঁকড়ে ধরল।
-কেমন আছ আব্বু? আর কিছু বলতে পারল না কেঁদে ফেলল।
বাইরে যারা ছিল তারাও দেখতে পেয়েছে। ওরা সবাই অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছে। বেশ কিছুক্ষণ ওভাবে থেকে রাশেদ সাহেব বললেন -চল আব্বু বাইরে যাই। টিকেট কেনার পর থেকেই শেভ হয়নি, মুখে খোঁচা খোঁচা কাচা পাকা দাড়ি। দোহা এয়ারপোর্টের টয়লেটের আয়নায় দেখেছে অনেক দাড়ি পেঁকে গেছে। এতদিন লক্ষ করেননি। বের হয়ে এলে আবার ছোটনের পালা, বাবাকে মেঝ বোনের মতই জড়িয়ে ধরে আর ছাড়তে চায় না। পাশে তিথি, রাজীব আর মনি দাঁড়িয়ে দেখছে কারো মুখে কোন কথা নেই।
রাশেদ সাহেব সবার দিকে তাকিয়ে মনিকে জিজ্ঞেস করলেন-
-তোমরা সবাই ভাল আছ?
এতক্ষণ স্বামীকে ফিরে পাবার আনন্দ আর এতদিনের বিরহের যাতনার মিশ্র অনুভূতিতে মনি কেমন যেন হতবিহবল হয়ে শুধু তাকিয়ে দেখছিল কিছু বলতে পারছিল না, এই প্রথম মুখ খুলল
-ভাল, তুমি কেমন হয়ে গেছ!
-কত সময় চলে গেছে মনে করতে পার?
তিথি বললো -চল গাড়িতে উঠি
-আব্বা আসেনি?
-এসেছে, গাড়িতে আছে, চল
গাড়িতে উঠে বাবাকে সালাম করে জিজ্ঞেস করলেন-কেমন আছেন?


২৫০
গাড়িতে বসে অনেকদিন পরে ঢাকা শহরের চেহারা দেখছেনঅনেক পরিচিত আপন জনের মত মনে হলেও যে ঢাকা শহর তার জন্য এক মুঠো অন্নের সংস্থান করেনি সে কথা মনে হয়ে আবার মনটা বিষাদে ভরে গেল। ঢাকা শহরের চাকচিক্য অনেক বেড়েছে রাস্তাগুলা বড় হয়েছে পাশে কাঁচের দেয়াল দেয়া দালান উঠেছে কিন্তু মানুষগুলা এখনও সভ্য হতে পারেনিযার যেখান দিয়ে ইচ্ছে রাস্তা পার হচ্ছে যে যে ভাবে পারছে গাড়ি চালাচ্ছে, অনেকদিন পরে গাড়ির হর্ন শুনলেনবাইরে থেকে এই দেখছে কিন্তু ভিতরে কি হয়েছে কে জানে! খবরে যা দেখে সে কোন সুখের খবর দেখতে পায় নি এত দিনেও। এ দেশের দুই পায়ে হাটা প্রাণীগুলা কবে মানুষ হবে কে জানে! গাড়ির ভিতরের মানুষগুলা কেমন যেন স্তব্ধ হয়ে যন্ত্রের মত বসে আছে শুধু পাশে বসা যূথী বাবার হাতটা শক্ত করে ধরে রেখেছে।
-কিছু খাবে আব্বু, ক্ষুধা লেগেছে?
-না, কি খাব একটু পরেই বাড়ি যাচ্ছি
-কিছু খাবার নিয়ে এসেছি খাও না একটু
-কি এনেছ?
-কাবাব আর পরটা, খাবে?
-না আব্বু নামার আগে প্লেন থেকে ব্রেকফাস্ট দিয়েছিল
-তাহলে একটু পানি খাও
-এনেছ? তাহলে একটু পানি দাও

আধা ঘণ্টার মধ্যেই বাড়ি এসে পৌঁছল। বাড়িতে ঢুকে দেখে সে যেখানে যা যেভাবে রেখে গিয়েছিল প্রায় সে ভাবেই আছে। খাবার টেবিলে তেমনি করে আচারের বয়াম সাজান রয়েছে। বীথী বাবার ব্যাগটা এনে খাবার টেবিলে নামিয়ে রাখল। হঠাৎ মনে হলো, রাশেদ সাহেব ব্যাগটা খুলে ওদের জন্য আনা হিরের কানের রিং বের করে দুই বোনের হাতে দিয়ে বললেন-
-কারো জন্য আর কিছু আনতে পারিনি আব্বু!
দুই বোনই আবার এক সাথে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললো-
-আর কিছু লাগবে না আব্বু, তুমি ফিরে এসেছ এতেই তো সব পেয়েছি আমরা, আর কি আনবে? আমাদের আর কিচ্ছু লাগবে না শুধু তুমি আমাদের কাছে থাক।
-আচ্ছা আব্বু আমি এই কাপরে আজ তিনদিন একটু চেঞ্জ করে নিই?
-হ্যাঁ আব্বু লুঙ্গি গেঞ্জি তোয়ালে বাথরুমে রেখেছি তুমি যাও
-চল একবারে গোসল করে নাও
-হ্যাঁ চল।
বলে ঘরে ঢুকে দরজা একটু চাপিয়ে দিয়ে মনি বুকে চেপে ধরল। কত দিনের এই বিরহ! এই কি আর দুই এক প্রহরে শেষ হয়? শেষ হবার নয়। ওই ভাবে বুকে চেপে কাঁধে মাথা রেখে বললো,
-তুমি কেমন হয়ে গেছ, শুকিয়ে একেবারে কাঠের মত দেখাচ্ছে, কত বদলে গেছ
-না তেমন আর কি বদলেছি সেই আগের মাপেই প্যান্ট সার্ট পরছি, তবে তুমি কিন্তু আরও সুন্দর হয়েছ, ফিরোজের বৌ বলেছিল কিন্তু আমার বিশ্বাস হয়নি।
অনেকক্ষণ এভাবে গেল। কারো মুখে আর কোন কথা নেই, শুধু অনুভব, একান্ত নিবির অনুভব যা ভাষায় ব্যক্ত হয় না শুধু অনুভূতি দিয়েই অনুভূত হয়।
-যাও গোসল করে আস আমি গরম পানি আনছি। মনি গরম পানি আনতে গেল আর রাশেদ সাহেব কাপর বদলে বাথরুমে ঢুকলেন। তার জন্য সদ্য কেনা ব্রাশ, তোয়ালে সব আগেই বাথরুমে রেখে দিয়েছে মনি দেখিয়ে দিল।


২৫১।
এয়ারপোর্ট থেকে রাশেদ সাহেবের ফোন পাবার পরেই সবাই অস্থির হয়ে গেল কি করবে আর কি করবে না। সব কেমন যেন গুলিয়ে গেল। একটু স্থির হয়ে মনি বীথীকে নিয়ে বাজারে গেল। রাশেদ সাহেবের যা যা পছন্দ সব এক এক করে কিনে আনল। সারা দিন রাতে সবাই একটা উৎকণ্ঠা আর অস্থিরতার মধ্যে কাটিয়েছে, কেও ঘুমায়নি। কখন রাত হবে, কখন রাত পোহাবে, কখন এয়ারপোর্টে যেয়ে এরাইভ্যাল মনিটরে দেখবে ফ্লাইট number 632 landed, আব্বু আসলে কে কি করবে তাই নিয়ে তিন বোনে মিলে জল্পনা কল্পনা করেছে আর এদিকে মনি  সব রান্না করেছে, ওরা এসে মাকে এগিয়ে দিচ্ছে, কি জানি কখন কোনটা খেতে চায়!
গোসল করে বের হয়ে মনে হলো ক্ষুধা লেগেছে, -কিছু খেতে দিবে?
-চল টেবিলে চল, দিচ্ছি।
টেবিলে এসে দেখে তার নিজের হাতে কিনে রেখে যাওয়া প্লেট, পেয়ালা, গ্লাস সবই মনি আর মেয়েরা যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছে। ডাইনিং স্পেসের বেসিনের উপরের আয়নাটা তারই নিজের হাতেলাগান, এখনও তার স্মৃতি নিয়ে জায়গামত আছে।
মনি নিজে গরম পরটা ভেজে আনল, সাথে তার প্রিয় আলু ভাজি আর শামি কাবাব।
-আর কিছু দিব? মাছের ঝোল আছে।
-না আর কিছু লাগবে না।
-চা খাবে নাকি কফি দেব
-কফিই দাও

নাশতা খেয়ে রাশেদ সাহেব এসে বিছানায় এলিয়ে পড়লেনআগে মনি কাছে না শুলে রাশেদ সাহেব ঘুমাতে পারতেন না। শুয়ে কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে ঘুম আসছিল না অথচ গত কয়েক রাত ধরে ঘুমায়নিঢাকা ছেড়ে যাবার পর থেকে এ পর্যন্ত  পিছনে ফিরে দেখে নিলেন, একবারে দশটি বছর। ভাবছিলেন এতদিন কি করে কেটেছে তাহলে? সবই স্বপ্নের মত মনে হচ্ছে। সে যে এসেছে, মনির বুকে মিশে রয়েছে মেয়েরা সবাই তার বুকের মধ্যে রয়েছে তবু যেন বিশ্বাস হতে চাইছে না। তার ধারনা ছিল সে আর কোনদিন দেশে ফিরে আসতে পারবে না। রাশেদ সাহেবের অবস্থা দেখে মনি এসে পাশে বসল। রাশেদ সাহেব আগের মত টেনে কাছে শুইয়ে দিল। ঘুম পাড়ানি যাদুর কাঠির ছোঁয়া পেয়ে পরম নিশ্চিন্তে একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়ল। মনি উঠে এসে দরজা ভিড়িয়ে দিলমাঝে মাঝে মনি আর মেয়েরা এসে উঁকি দিয়ে দেখছে, অঘোরে ঘুমাচ্ছেবাবা কখন উঠবে কখন বাবার সাথে সেই আগের মত গল্প করবে লুডু খেলবে! কত দিনের গল্প জমে আছে কত কি বলার জন্য জমে আছে! মনি ঘরে এসে খাটের পাশে মোড়ায় বসে নির্বাক তাকিয়ে রইল স্বামীর মুখের দিকে।

মনে ভেসে এলো অনেক স্মৃতি, সেই ছোট বেলা থেকে যার সাথে এতগুলা বছর কাটিয়েছে এই মানুষটাকে ছাড়া সে কিভাবে কাটিয়েছে এই দিনগুলা! মনিরও বিশ্বাস হচ্ছে না সত্যিই এসেছে নাকি! একটু পরে পরে ছুঁয়ে ছুঁয়ে তার অস্তিত্ব অনুভব করছে। যার বুকের ছোঁয়া না পেলে মনে হোত তার কি যেন নেই, যার গায়ের গন্ধ না পেলে ঘুম আসত না, সেই মানুষটা কোথায় চলে গেল! কোথা থেকে কি হয়ে গেল! ভাবতে ভাবতে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারল না, চোখের পানি থামিয়ে রাখতে পারল না। আস্তে আস্তে আঁচল ভিজছে। তার প্রাণ আজ তার বুকে ফিরে এসেছে। একেবারে সন্ধ্যার পরে ঘুম ভাঙল। ঘুম ভেঙ্গে উঠে বাথ রুম সেরে এসে দেখে তিথি চা নিয়ে এসেছে।
-আব্বু ক্ষুধা লেগেছে, আগে কিছু দাও খেয়ে নেই তারপরে চা খাই
-কি খাবে আব্বু, আম্মু গরুর মাংস দিয়ে খিচুরি আর বিরানি রেঁধেছে
-তাই নাকি! তাহলে সবই একটু একটু করে দাও
কতদিন পরে মনির নিজের রান্না! মনির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, -তুমি এখনও রাঁধতে পার?
-ভুলে গেছিলাম, তুমি আসবে বলে আবার মনে পড়েছে
রাশেদ সাহেব খাচ্ছেন, অমৃতের মত মনে হচ্ছে। পাশে বসে মনি এবং মেয়েরা বাবাকে দেখছে।
খেয়ে চায়ের কাপ হাতে মেয়েদের নিয়ে জামাইকে নিয়ে বসার ঘরে বসলেনঅনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা চলল। রাজীব রাশেদ সাহেবকে নামিয়ে দিয়ে অফিসে চলে গিয়েছিল আবার তাড়াতাড়িই ফিরে এসেছে।
-আব্বু রিং দুইটা কি তোমাদের পছন্দ হয়েছে? একটু পর না দেখি কেমন লাগে
বীথী আর যূথী উঠে এসে রিং নিয়ে পরে বাবাকে দেখাল, -আব্বু খুব ভাল হয়েছে
-বেশ, ভাল হলেই ভাল
[চলবে]

No comments:

Post a Comment

Follow by Email

Back to Top