নক্ষত্রের গোধূলি-[১২৫]-১২৪

২৬২।
বাগান, মাছের দেখাশোনা করে। সন্ধ্যা হলে গ্রামের মানুষ কাজকর্ম সেরে চা খাবার জন্য রাশেদের কাছে এসে বসে। মনিরা এই গ্রামের  মেয়ে আবার রাশেদ সাহেবও এই গ্রামেরই ছেলে। বাইরে রাশেদ সাহেব হলেও গ্রামে গুরুজন বা
সমবয়সীদের কাছে সে রাশেদই রয়ে গেছে এদের কাছে সাহেব হবার কোন সাধ তার নেই। তারা এসেই হাঁক দেই মনিরা ছালমার মাকে চায়ের পানি বসাতে বল! প্রতিবারে ঢাকা গেলে মনিরা ফেরার পথে সবার জন্য ভাল ভাল বিস্কুট চানাচুড় নিয়ে আসে। মাঝে মাঝে নিজেই কেক বানিয়ে দেয়। গরম কেক খেয়ে একদিন মোতালেব চাচা বলছিল দেখেছ গ্রামের মেয়ে আর গ্রামের ছেলের এক ঘর হলে কত সুবিধা!  এই এমন গরম কেক কিকোনদিন আমরা খেয়েছি? দুইজনেই সমান, সবার কাছেই সমান আবদার! এতদিন ওরা গ্রামে ছিলনা দেশে বিদেশে ঘুরে বেড়িয়েছে বলে দেখা পাইনি আর আজ আবার আমাদের গ্রামের ছেলে মেয়ে গ্রামেই ফিরে এসেছে এযে কত আনন্দের ব্যাপার! এতদিন পরে সবাইকে পেয়ে সবাই খুশি, সবার সাথে আড্ডা দিয়ে বেশ সুখেই দিন যাচ্ছে। অনেকেই আসে টিভি দেখার জন্য, দেশ বিদেশের খবর জানার জন্য। কে কোথায় কি চিকিৎসা করাতে যাবে সে পরামর্শের জন্যেও অনেকে আসে। কার ছেলেকে কোথায় ভর্তি করবে সে কথা রাশেদ সাহেবকে বলে দিতে হয় তবে সে বলে দিয়েছে আমাকে কোন সালিশ দরবারে কেও ডাকবে না। ডাকলেও মনি যেতে দেয় না। মোটামুটি নির্ঝঞ্ঝাটে থাকার চেষ্টা করে। বিকেলে মাঠে গিয়ে ছেলেপিলেদের খেলা দেখে, কোনদিন মনিও সাথে যায়। গ্রামে মনির সব জায়গায় অবাধ যাতায়াতে কোন বিধি নিষেধ নেইসাথেই শ্যালকের বাড়ি, পুকুর পাড়েই রাস্তা আর রাস্তার সাথেই এমরানের বাড়ি। কয়েকদিন পরে পরেই এটা সেটা নানান উছিলায় শারমিনের নিমন্ত্রণে যেতে হয়।
নতুন পরিবেশে রাশেদ সাহেব বেশ মানিয়ে নিয়েছেনমনি নিশ্চিন্ত। যাকে নিয়ে এত ভাবনা ছিল সে তো দেখছি ভালই মানিয়ে নিয়েছে। যে মানুষটা সারা জীবন শহরে কাটিয়েছে সে যে এই গ্রামে এসে এত আনন্দে থাকতে পারবে এ কথা মনি কক্ষনও ভাবতে পারেনি।


২৬৩।
এ বাড়িতে আসার পরের বছরে তিথি, রাজীব আর যূথী এসেছে। তিথির বাচ্চা হবে, পরে আর সহসা আসতে পারবে না বলে মা বাবাকে এবার নিয়ে যাবে তবে তাদের স্থায়ী ব্যবস্থা এখনও করতে পারেনি। বেড়াতে নিয়ে যাবে, অন্তত ছয় মাস থেকে আসবে। ওখানে রাজীব ভাল একটা চাকরি পেয়েছে। পাবে না কেন? ইংল্যান্ডের ডিগ্রি আছে পকেটে। যূথীর পিএইচডি হয়ে গেছে ওখানেই চাকরী পেয়েছে, ছুটি থেকে ফিরেই জয়েন করবে। ওখানে ছোট চাচা থাকে কিন্তু তার সাথে এখনও দেখা করেনি তবে ফোনে আলাপ হয়েছে। রাজীব বললো এবার যূথীর একটা বিয়ে দিলেই হয়ে যায়। হ্যাঁ দেখতে হবে দেখ খোজ খবর কর। বারবার বীথীর কথা মনে হচ্ছে। বীথী আসতে পারলে কতদিন পরে তিন বোন একসাথে হতে পারত।
তিথি আর রাজীব প্রায় দুই সপ্তাহ চিটাগাং থেকে আসল মায়ের কাছে। দুই মেয়েকে নিয়ে হৈ চৈ করে কোথা দিয়ে এক মাস চলে গেল টের পেল না।

এবার অস্ট্রেলিয়ার পার্থে যাবার পালা। মনি আর তিথি ফাঁকে ফাঁকে গুছিয়ে নিয়েছে। গোছগাছ করে এমরান আর শারমিনের কাছে বাড়ির দায়িত্ব দিয়ে ওরা ঢাকায় চলে আসল। পরশু ফ্লাইট। ঢাকায় কল্যাণপুরে তিথির বড় খালার বাড়ি উঠবে। আহসান জানে, সে এসে দেখা করবে। তিথিরা বাবা মাকে নিয়ে চলে যাবে তার দুই দিন পরেই যূথীর ফ্লাইট।
সময়মত সবাই যার যার গন্তব্যে পৌঁছে গেলরাশেদ সাহেব পৃথিবীর অনেক দেশে ঘুরলেও অস্ট্রেলিয়া আসেনি। তবে শুনেছে পৃথিবীতে তিনটা পার্থ আছে একটা আমেরিকায়, একটা স্কটল্যান্ডে আর একটা এই অস্ট্রেলিয়ায়। স্কটল্যান্ডের পার্থ দেখেছেন এবার অস্ট্রেলিয়ায় এসেছেনশুধু আমেরিকারটাই বাকি রইল। সব পার্থই সুন্দর শহর। রাশেদ সাহেব নানা দেশে থেকেছেশীত, গরম, পাহাড়ি, মরু এলাকা, বনভূমি সব জায়গায়ই থেকেছেন তাই সে সব জায়গায়ই মানিয়ে নিতে পারেনওরা এখনও নিজেদের বাড়ি কিনতে পারেনি ভাড়া বাসায় থাকে তবে এলাকাটা বেশ ছিমছাম সুন্দর। কিন্তু মনির ভাল লাগছে নাসারাক্ষণই প্রায় ঘর বন্দি হয়ে থাকতে হয়। রাশেদ সাহেব বলেন, থাক, ছয় মাস দেখতে দেখতে চলে যাবে। তোমার নতুন বন্ধু আসছে তার একটু যত্ন করে যাবে না? ওরা আসার দুই মাস পর তিথির মেয়ে হলো। ছোট খালা সবার নাম রাখে তাই ওকেই বলা হলো ভাগ্নির নাম দেখ। ছোট খালা নাম রাখল নবমিতা। অনেক প্রতীক্ষার পর নাতনীর দেখা পেয়ে মনি সব ভুলে গেল। হাসপাতাল থেকে ফেরার পর সারাদিন শুধু নাতনীকে নিয়েই ব্যস্ত। দেখতে দেখতে কোথা দিয়ে যে ছয় মাস কেটে গেল টের পেল না।

এবার ফেরার পালা। বিদায় কখনওই মধুর হয় না। রাজীব ড্রাইভ করে না। তিথিকেই মা বাবাকে নিয়ে এয়ারপোর্টে আসতে হলো। পাশে রাজীব বসেছে। পিছনে মায়ের কোলে বাচ্চা আর পাশে বাবা তিথি কথা বলছে না তেমন, ড্রাইভ করছে। রাজীব কথা বলছে।
-আব্বা আম্মা আপনাদের কাগজ পত্র খুব তাড়াতাড়িই হয়ে যাবে তখন বাড়ি কি করবেন?
-দেখি কিছু একটা করতে হবে, আর কীইবা করব, যেমন আছে তেমনিই থাক
-আপনারা আজ এখানে থাকবেন কাল কানাডায় থাকবেন তো ওখানে কখন থাকবেন?
-তাহলে তুমি কি বল?
-না আমি কিছু বলছি না, যেমন আছে তেমনি থাক, আপনি যা বলছেন মাঝে মাঝে আমরাও যেতে পারব এখানেও শহর, চিটাগাং গেলে মাও শহরে থাকে, শহর আর কত ভাল লাগে? ঠিক আছে আপনি যা বলছেন তাই থাক, মামারা দেখবে।
কথা বলতে বলতে পার্থ এয়ারপোর্ট পৌঁছে গেল। আবার বিদায়ের কান্নাকাটি। মনি কিছুতেই নাতনীকে ছেড়ে আসবে না। কি মুশকিল! অনেক বুঝিয়ে তারপরে তিথির কোলে দিয়ে আসতে হলো। আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে প্লেনে উঠ বসল কিন্তু এই কান্না কি আর সহজে থামে! প্রথম নাতনী! রক্তের টান, সহজেই ছেড়ে আসা যায় না। তবুও চির চেনা রীতি ভেঙ্গে ফেলার কোন উপায় নেই আসা আর যাওয়া নিয়েই জীবনএকবার আসবে আবার যাবে অনাদিকাল ধরে এইতো চলে আসছে।
কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্ট মনি এবং রাশেদ সাহেবের চেনা এয়ারপোর্ট। তিন ঘণ্টার ট্রানজিট। ভিতরে হাঁটাহাঁটি করে দেখতে দেখতে কেটে গেল।  এবার ঢাকার ফ্লাইট। 


২৬৪।
আহসান এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে আসল। এখানেই কয়েকদিন থেকে পথের ধকল কাটিয়ে আবার ফিরে এলো গ্রামের বাড়ি। বীথীর আসার সময় হয়েছে। মাকে আগেই জানিয়েছে আমি এবার গ্রামে যেতে পারব না ঢাকায় অনেক কাজ আছে, তোমরা ঢাকা চলে এসো। তাই আসা হলো। জামাইর জন্য, মেয়ের জন্য পিঠা, খৈ, নিজের বানানো গ্রামের খাটি গরুর দুধের দৈ আর বাগানের সবজি নিয়ে এসেছে। বীথীর যাবার আগ পর্যন্ত পুরো একমাস ঢাকায় থাকল। কয়েক মাসের মধ্যে হয়ত থাইল্যান্ডের কোথাও পোস্টিং হতে পারে, তারপরে চেষ্টা করবে ঢাকায় আসতে। বীথী চলে যাবার পরে ফিরে এলো গ্রামে। কিছুদিন পরে তিথি জানাল ওদের এপ্লিকেশন গ্রান্ট হয়েছে আবার যূথীও জানাল সেও কানাডায় মা বাবার জন্য এপ্লাই করেছে। শিগগীরই হয়ে যাবে।

পার্থ থেকে ফিরে আসার কয়েক মাস পরেই টরন্টোতে যূথীর বিয়ে হলো। ঢাকার বাড়ি ছেড়ে আসার পর রাশেদ সাহেব তার বাবা বা ভাই বোনদের সাথে আর কোন যোগাযোগ রাখেনি। যূথী কানাডা আছে বলেই হয়ত ছোট চাচা টেলিফোনে প্রিয় ভাতিজীর খোঁজখবর নেয়।  ছোট চাচাই খোঁজখবর করে মেয়ের বিয়ে দিয়েছে। তারই পরিচিত দিনাজপুরের এক বন্ধুর ভাতিজার সাথে। ছেলে ওখানেই পড়াশুনা করে আমেরিকান এক কোম্পানিতে চাকরি করছে। বেশ ভাল অবস্থা, বাড়ির অবস্থাও ভাল। বাবা মা এবং বোনেরা সবাই এলোমেলো ভাবে নানা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বলে রাজীবের সাথে আলাপ করে ওখানেই ব্যবস্থা করেছে। নাহিদ আগে ভাইকে জিজ্ঞেস করেছিল কিন্তু রাশেদ সাহেব রাজীবের কথা বলে দিয়েছে, ওর সাথে আলাপ কর। রাজীব শ্বশুরের মতামত জেনে সম্মতি জানিয়ে দিয়েছে। ভালই হয়েছে। বিয়ে হবার কথা, এক জায়গায় হলেই হলো। তবুও মনি একটু মন খারাপ করতে চেয়েছিল কিন্তু রাশেদ সাহেব তার অভিজ্ঞতা থেকে যা জেনেছে তেমনি করে বুঝিয়ে শান্ত করেছেন-আমরা ওখানে গেলে তো দেখা হবেই, এত মন খারাপ করছ কেন? দেখ না তিথির বিয়েটা কেমন করে হলো! আমরা কি কেও কোনদিন ভেবেছিলাম? নিয়তি যে ভাবে আমাদের চালাচ্ছে আমাদের সেই ভাবেই চলতে হবে। তুমি আমি কি এগুলা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি? তাহলে মেনে নেয়াতেই শান্তি। শুধু শুধু মন খারাপ করছ কেন?
-না আমি ভাবছি দুই মেয়েরই বিয়ে হলো আমরা কেও কাছে থাকতে পারলাম না।
-কোথায় কেও থাকলাম না, তিথির বিয়ের সময় আমি ছিলাম দুই চাচা ছিল এবারে ছোট চাচা বিয়ে দিচ্ছে, জীবনটা এমনই মনি, নিজের কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না।

যূথীর বিয়ের পর বীথীর ছেলে হলো। এবারও ছোট খালাই নাম রাখল আফরাজ। ছেলে হবার আগে বেশ কয়েক মাস ম্যাটারনিটি লিভ নিয়ে মা বাবা সহ ঢাকায় ছিল। ছোট বাচ্চা রেখেও যেতে পারে না আবার নিয়ে গেলে কে দেখবে তাই মা বাবাকে নিয়ে বাচ্চা কোলে বীথী ব্যাংকক গেল। ওখানে মাস ছয়েক থেকে নাতিকে নিয়ে কাটিয়ে আবার বীথীর ছুটির সময় হলে ওকে নিয়ে একবারে ঢাকায় ফিরে আসল। ছেলে হবার পর অনেক অনুরোধ করল ঢাকায় পোস্টিঙের জন্য কিন্তু ওপর থেকে জানাল এখন তোমার এপ্লিকেশন বিবেচনা করা যাচ্ছে না তবে আমরা তোমাকে ওয়েটিং লিস্টে রেখেছি নেক্সট সুযোগ হলেই দিয়ে দিবএত ভাল চাকরি ছাড়তেও পারছে না আবার ছেলে বড় করাও সমস্যা। কি করবে, এর পরের বারে শাশুড়িকে নিয়ে গেল।
[চলবে]

No comments:

Post a Comment

Follow by Email

Back to Top