একটি কাল রাত

বাংলাদেশের একটি সমুদ্র বন্দরে চাকরি করছি তখন।  স্ত্রী সন্তান নিয়ে ওখানেই কর্তৃপক্ষের বাসায় বসবাস করি। দিন গুলি বেশ কেটে যাচ্ছে। হঠাৎ অফিসের একটা জরুরী কাজে ৩/৪ দিনের জন্য ঢাকায় শিপিং অফিসে এসেছিলাম।

ঢাকায় নিজেদের বাড়ি বলে সঙ্গত ভাবে এখানেই থেকে কাজ সেরে আবার চলে যাব। শেষ দিনে অর্থাৎ ১৯৮৫ সালের ২৫শে মে তারিখে সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে শিপিং অফিসে যাবার আগে ঢাকা লিয়াজো অফিসে গেলাম ওখানে যারা আছে তাদের সাথে একটু সৌজন্য সাক্ষাত করতে। লিয়াজো অফিসার খালেক সাহেব দেখেই সালাম দিয়ে এগিয়ে এসে বলল স্যর কবে এসেছেন, কেমন আছেন ইত্যাদি বলে বলল আপনি তো ঢাকায় এলে বাড়িতেই থাকেন এদিকে আসেন না তাই আপনার সাথে তেমন দেখাও হয় না। শিপিং অফিসে যাবেন জানি, তবে স্যর আজ কিন্তু দুপুরে এখানে এসে খেয়ে যাবেন। কেন, কি ব্যাপার খালেক সাহেব, আজ কি কোন বিশেষ আয়োজন আছে না কি?হ্যাঁ একটু আছে। আচ্ছা ঠিক আছে দেখি যদি সুযোগ পাই তাহলে আসব। তবে খারাপ ওয়েদার চলছে কি জানি কি হয়। আমি চেষ্টা করব আজ যদি কাজ শেষ করতে পারি তাহলে আজই রাতের কোচে চলে যাব বলে আর যারা ছিল তাদের একটু হ্যালো বলে বের হয়ে গেলাম।

বন্দরের নিজস্ব কয়েকটা জাহাজের জরিপ কাজের কিছু আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে ডিজি শিপিং এর সাথে আলোচনা করে একটা চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেয়ার কথা। আলোচনা শেষে খসরা চিঠি টাইপ করে ডিজি সাহেবের সই স্বাক্ষর নিয়ে অফিস অর্ডার ইস্যু করে আমার কপি নিয়ে বের হয়ে এলাম। এখানে একটু বলে নেই যে ডিজি সাহেব কিছু দিন আগে আমাদের ডাইরেক্টর (এডমিন) ছিলেন বলে কাজটা বেশ একটু দরদ দিয়ে তারা তারি করে দিলেন। বিকেল ৫ টায় ৯ তলা অফিস থেকে নেমে বাইরে বের হয়ে দেখি আকাশ কাল হয়ে গেছে। জীবনের বেশ অনেকটা সময় সাগরে কাটিয়েছি, বর্তমানে সামুদ্রিক বন্দরে কাজ করছি কাজেই আকাশের চেহারা দেখে কিছুটা নয় বেশ অনেকটা অনুমান করতে পারি কি হতে চলছে। এজন্য বেরো মিটার, হাইগ্রো মিটার এসব দেখার দরকার হয় না। দুপুরে খালেক সাহেবের নিমন্ত্রণে যেতে পারিনি। মতিঝিলের শিপিং অফিস থেকে সেগুন বাগিচার লিয়াজো অফিসে গেলে এই কাজ আজ শেষ হতো না। তবে খালেক সাহেবকে ফোনে বলে দিয়েছিলাম।

আকাশের অবস্থা দেখে মনে কেমন যেন একটা আতঙ্ক এসে ভর করল। দক্ষিণের আকাশ লালচে। কোথাও একটু সময় নষ্ট না করে একটা স্কুটার নিয়ে মিরপুরে বাড়িতে চলে এলাম। তবুও প্রায় ৭ টা বেজে গেল। বাড়ি থেকে যত তারা তারি পারি মংলার উদ্দেশ্যে বের হতে হবে। মা বেঁকে বসলেন, এই অবস্থায় কি ভাবে যাবি? একটা দোটানায় পরে গেলাম। ওদিকে ওরা এত বড় বাড়িতে মাত্র তিনটে প্রাণী তার দুই টাই আবার ছোট, কি করবে?এমন সময় টিভিতে বিশেষ সংবাদ বুলেটিন প্রচার করছে। তারা তারি টিভির সামনে যেয়ে দাঁড়ালাম একটি বিশেষ সংবাদ, আবহাওয়ার বিপদ সঙ্কেত, সকল নদী বন্দরের জন্য ৪ নম্বর এবং মংলা বন্দরে ১০ নম্বর চট্টগ্রাম বন্দরে ৭ নম্বর মহা বিপদ সঙ্কেত প্রদর্শন করতে বলা হচ্ছে। মাই গড! এর মানে নদী পথ বন্ধ, সমুদ্র বন্দরে যে সব জাহাজ আছে তারা স্ট্যান্ডবাই থাকবে যে কোন সময় জেটি ছেড়ে যেতে এবং জেটি ছাড়তে হলে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে নিবে। ভয়ঙ্কর বিপদ। মংলা যেতে হলে পদ্মা নদী পার হয়ে যেতে হবে ওদিকে খুলনায় রূপসা নদী পার হতে হবে অথচ কোন নদীতেই ফেরি চলবে না। তার মানে আজ মংলা যাবার কোন উপায় নেই।

বাইরে বের হয়ে দেখি দক্ষিণের আকাশ আগুনের মত লাল হয়ে গেছে, বাতাস নেই, চারিদিকে একটা স্তব্ধ ভাব। তার মানে দক্ষিণে প্রচণ্ড কিছু হচ্ছে। বাসায় ফোন করলাম ফোন যাচ্ছে না। মংলার হারবার কন্ট্রোলে ফোন করলাম কোন জবাব নেই। খুলনার পোর্ট কন্ট্রোল রুমে ফোন করলাম শুধু এনগেজড পাচ্ছি। লিয়াজো অফিসে একটা ওয়ারলেস আছে।
ওখানে ফোন করলাম,
খালেক সাহেব মংলার খবর কি?
না স্যর কোন খবর পাচ্ছি না। মংলায় আমাদের হারবার কন্ট্রোল, পোর্ট কন্ট্রোল বা মংলা রেডিও কেউ কল রিসিভ করছে না বা ওদের কোন কথাও শুনছি না। আপনার সেট কিসে চলছে ব্যাটারিতে নাকি পাওয়ারে?
আমরা স্যর সব সময় পাওয়ারেই চালাই।
আপনার রিসিভার ঠিক আছে?চিটাগাং পোর্টে বা ডায়মন্ড হারবারের কোন সারা পাচ্ছেন?
শুধু চিটাগাংয়ের  কিছু কথা শোনা যাচ্ছে।
আচ্ছা চিটাগাং পোর্টকে একটু বলে দেখেন ওরা মংলা পোর্টকে পাচ্ছে না কি। ফোনে শুনছি খালেক সাহেব চিটাগাং পোর্টকে ডাকছে। ওরা জবাব দিল তাও আমি শুনছি।
না, আমরাও মংলা পোর্টকে পাচ্ছি না।
আচ্ছা খালেক সাহেব মংলায় যে জাহাজ গুলি আছে তাদের কাওকে একটু ডেকে দেখেন তারা কেউ কোন জবাব দেয় নাকি।
হ্যাঁ স্যর এটা করে দেখি।
দেখেন আমাকে জানাবেন কি হল।

একটু পরে খালেক সাহেব ফোন করে জানাল যে মংলার কেউ কোন সারা দিচ্ছে না তবে ফেয়ার ওয়ের কাছে আউটার এঙ্কোরেজ থেকে এক জাহাজ আমার ডাকাডাকি শুনে আমাকে বলল মংলা ইজ অবজার্ভিং হেভি স্টর্ম উইথ হাই সি
তার মানে ওদের এনটিনা ফেল কিন্তু এক সাথে তিনটা এনটিনা ফেল হয় কি করে?নিশ্চয়ই যা ভেবেছি তেমন কোন প্রচণ্ড কিছু হয়েছে না হলে এমন হতে পারে না।
কালো মুখ দেখে মা বাবা সবাই আস্তে করে জিজ্ঞেস করলেন
কি, কোন খবর পেলি?
না, সব বন্ধ।
মানে?
যোগাযোগের সব পথ বন্ধ। কোন খবর জানা যাচ্ছে না। দূরে ফেয়ার ওয়ে বয়ার কাছে থেকে একটা জাহাজ জানিয়েছে যে মংলার উপর দিয়ে প্রচণ্ড ঝড় বইছে সাথে জলোচ্ছ্বাস। মনে হয় ঝড়ে সব ওয়ারলেসের এরিয়েল ভেঙ্গে গেছে, হয় তো বিজলী বন্ধ যার জন্য টেলি ফোন কাজ করছে না।
মা উদ্বিগ্ন হলেন। তাহলে ওরা কি করছে?
কি আর করবে, পাশে রহমান সাহেব আছে ওরা সবাই মিলে যাহোক একটা পথ বের করে নিয়েছে।
একটু পরে আবার খালেক সাহেব ফোন করে জানাল যে বাগেরহাট ডিসি অফিসে ফোন করে জেনেছে মংলার উপর দিয়ে প্রচণ্ড বেগে ঝড় বয়ে গেছে প্রথম ধাক্কায় পাওয়ার লাইনের মেইন গ্রিডের যে পোল তার একটা সহ কয়েকটা বিদ্যুৎ বাহি পোল ভেঙ্গে গেছে বলে বিদ্যুৎ বন্ধ, সাথে ছিল ৭/৮ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস, নদী থেকে কয়েকটা বড় লঞ্চ ডাঙ্গায় চলে এসে আটকে গেছে। জলোচ্ছ্বাস দুই ঘণ্টার মত ছিল তবে মানুষ জনের কোন ক্ষতির খবর তারা পায় নি। পোর্টের জেটি থেকে সব জাহাজ কাস্ট অফ করে মিল স্টিমে ভেসে ছিল, বন্দরের সব কাজকর্ম বন্ধ হয়ে আছে। খালেক সাহেবকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফোন রেখে দিলাম, রাখার আগে খালেক সাহেব বলল চিন্তা করবেন না স্যর, সবাই ভাল আছে।
হু। জলোচ্ছ্বাসের এই ৭/৮ ফুট উচ্চতা হিসেব করে মোটামুটি একটা আন্দাজ করলাম তাহলে আমাদের আবাসিক এলাকায় নিচতলার বাসা গুলিতে অন্তত দুই ফুট পানি ঢুকেছে। ভীষণ রকমের উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করছি কখন নদী বন্দরের সঙ্কেত কমবে। এই ঘটনার ঠিক তৃতীয় দিন সকালে রেডিওতে খবর শুনে সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পরলাম। গাবতলি এসে সোহাগ কোচে একটা টিকেট নিয়ে বসে পরলাম। কোচ যতই খুলনার দিকে এগুচ্ছে ততই মনে হচ্ছে যেন হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন বাড়ছে।

দুপুর ৩ টার দিকে খুলনা পৌঁছে রিকশায় রূপসা ফেরি ঘাটে। ফেরি পার হয়ে মংলার বাসে। বাস মংলার দিকে এগুচ্ছে আর একটু একটু করে ঝাড়ের কীর্তি দেখছি। দিব রাজের কাছে এসে চমকে গেলাম ওই তো পোল গুলি ভেঙ্গে পরে রয়েছে, পশুর নদীর পাড়ে ৩/৪ টা বড় বড় লঞ্চ ডাঙ্গায় পরে আছে, গাছ পালা ভেঙ্গে চুড়ে নাস্তা নাবুদ অবস্থা এমন প্রলয়ঙ্করী ঘটনা এর আগে কখনো দেখিনি। বাসায় গিয়ে কি দেখব, স্ত্রী সন্তানরা কি অবস্থায় আছে ভেবে ভেবে ঢাকা থেকে এই পর্যন্ত সারাটা পথে যা হোক তাই মেনে নেয়ার মত মনকে শক্ত হতে বলছি কিন্তু মন ততই বিদ্রোহ করছে কিছুতেই মানতে রাজী হচ্ছে না। এইতো কাছে এসে পরেছি, আবাসিক এলাকা দেখা যাচ্ছে, ওই তো আমি যে বিল্ডিংয়ে থাকি দেখা যাচ্ছে। বাস থেকে নেমে দেখি জায়গায় জায়গায় জলোচ্ছ্বাসের পানি জমে রয়েছে, প্রায় সব বাসার জানালা ভাঙ্গা, কাচ ভাঙ্গা কেউ কেউ চট বা অন্য কিছু দিয়ে আপাতত ঠেকিয়ে রেখেছে। বাসার কাছে এসে নিচে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। এত শখের বাগানের ফুল গাছগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, দোতলার বাসার দিকে তাকিয়ে কারো কোন সারা না পেয়ে ভয়টা আরও জেঁকে বসল। পা চলতে চাইছে না। কিছুতেই সিঁড়ি ঘরের ভিতর ঢুকতে পারছি না। এই বিল্ডিংয়ের সব ফ্ল্যাটের জানালা ভাঙ্গা, আমার বাসার ব্যালকনির দরজা খোলা রয়েছে দেখলাম। কতক্ষণ দাড়িয়ে ছিলাম মনে করতে পারছি না। পাশের বাসার রহমান সাহেবের ছোট ছেলে তুহিন ব্যালকনিতে এসে আমাকে দেখেই ডেকে উঠল কাকা এসেছেন?আস্তে করে ওর দিকে তাকিয়ে কি বলব কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না। তুহিন এক দৌড়ে ব্যালকনি থেকে ভিতরে চলে গেল নিচে থেকে ওর দুম দাম পায়ের শব্দ শুনলাম। একটু পরেই আমার স্ত্রী মেঝ মেয়েকে কোলে নিয়ে ব্যালকনিতে এসে আমাকে দেখে ডাকল,
কি হোল ওখানে কি কর ভিতরে এসো।

এই এতক্ষণে যেন আমার পা একটু একটু জোর পাচ্ছে। সিঁড়ির দিকে এগিয়ে আস্তে আস্তে উপরে উঠছি পায়ের শব্দ পেয়ে উপরে তাকিয়ে দেখি মেয়ে কোলে নিয়ে ও নিচে নেমে আসছে। আমার কাছে আসতেই আমি ওর হাত চেপে ধরলাম।
তুমি তোমরা আছ? আমার যে বিশ্বাস হচ্ছে না।
ঘরের ভিতর ঢুকেই কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে মেয়েকে কোলে নিলাম, পাশে বড় মেয়ে এসে দাঁড়াল। মা মেয়ে সহ সবাইকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে মনে হচ্ছিল যেন চেপে বুকের সাথে মিশিয়ে ফেলি।
বড় মেয়ে বলে উঠল আব্বু ব্যথা পাচ্ছি।
সম্বিত ফিরে পেলাম। ছেড়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম কি করেছিলে?
শুনছি। বিকেলেই মসজিদের মাইকে সবাইকে সাবধান করে দিয়েছিল, আপনারা সবাই নিজ নিজ বাসায় ফিরে যান, নিচ তলায় যারা থাকেন তারা মালামাল সামলে রেখে উপর তলায় কারো বাসায় চলে যাবেন। সন্ধ্যার একটু আগে হঠাত্ করেই শুরু হোল ঝড়। জানালা দুইটা বন্ধ করতে পেরেছিলাম ওই দুইটাই ভাল আছে বাকী সব এক ঝটকায় ভেঙ্গে গেল, সাথে সাথে কারেন্ট নেই, চার্জার লাইট দিয়ে যা হয় তাই। ফোন উঠিয়ে দেখি ডায়াল টোন নেই। মুষল ধারে বৃষ্টি, ঝড়ের সাথে বৃষ্টির ঝাপটায় সমস্ত ঘর ভিজে একাকার। এমন সময় তুহিনের মা এসে আমাদের নিয়ে গেল। নিচে থেকে বিকাশ বাবু, নাহারদের বাসার সবাই রহমান ভাইর বাসায় চলে এলো। সবাই ওখানে। সন্ধ্যার একটু পরেই সামনের মাঠে দেখি প্রায় হাঁটু পানি, পানি বেড়ে বেশ অনেক খানি হয়ে গেল। দেখো নিচে দাগ আছে। সিঁড়ি ঘরে বের হলাম সবাই। নিচে দেখি দরজার অর্ধেক পানি। ঘণ্টা দুই আড়াই ছিল এর মধ্যেই সব চুরমার। রাতে আমার আর তুহিনের মা যা রান্না করা ছিল তাই দিয়েই সবাই কিছু কিছু করে খেয়ে নিলাম। নাহারের মা, বিষ্ণুর  মা আফসোস করছে তাদের রান্না করা খাবার আনবে কেমনে, ঘর ভরা পানি। সকালে নিচে নেমে দেখলাম কি প্রলয় হয়ে গেছে, বাগানে কিচ্ছু নেই।
যাক যা হবার হয়েছে, তুমি ভয় পেয়েছ?
না সবাই এক সাথেই ছিলাম বলে তেমন ভয় পাইনি। তুমি কি করেছিলে?
এক এক করে সব ঘটনা বললাম। এখানে এসেও যে কেন ঘরে ঢুকার সাহস পাচ্ছিলাম না তা বলতেও বাদ দেইনি।

No comments:

Post a Comment

Follow by Email

Back to Top