মম চিত্তে নিতি নৃত্যে -[২৭]-৩

আমাদের দেশের কেউ যদি এই ভাবে কোন দেশে পৌছাতে পারত তাহলে আমরাও আজ বিশ্বজুড়ে রাজত্ব করে বেড়াতাম। কি জানি তারা কেউ কি এভাবে চিন্তা করেছিলো? মনে হয় না। কারণ ইতিহাস দেখলে দেখা যায় আমাদের

দেশের কোন নাবিক টেন্ডল বা সারেঙ্গের উপরে যেতে পারেনি। তাদের কারো কি ক্যাপ্টেন হবার সাধ জাগেনি? জাগলে কি আর এমন হতো! নিজেই নিজের প্রশ্নের জবাব দেয়। হঠাৎ করেই ওর ভাবনার তার ছিড়ে যায়। এতক্ষণে কফি শেষ হয়ে গেছে, অনেকক্ষণ খালি কফির কাপ স্ক্রিনের এক পাশে না নামিয়ে রেখে হাতেই ধরে বসে সামনে তাকিয়ে ভাবছিল।
ঘড়ির দিকে তাকাল, পরবর্তী পজিশন নেয়ার সময় হয়েছে। এবার উঠে এলো। রাডারের পর্দায় চেয়ে দেখে প্রায় পঞ্চাশ মাইল দূরে সামনের পাঁচ ডিগ্রি ডানে একটা জাহাজ দেখা যাচ্ছে। ঘড়িতে আবার সময় দেখে চার্ট টেবিলের কাছে এসে পজিশন নিয়ে নিলো। জাহাজ কোন দিকে ড্রিফট করেনি। স্টিয়ারিং হুইলের সামনে জাইরো কম্পাসের মনিটরে তার নিজের হেড দেখে নিলো, জাহাজ কত ডিগ্রী কোর্সে চলছে। কোর্স ঠিক আছে। একটু পরে আবার রাডারের পর্দা। যে জাহাজ দেখা গিয়েছিল সেটা তাদের স্টার বোর্ড (ডান) সাইড দিয়ে পিছনের দিকে চলে যাচ্ছে। আজকের মত ছয়টা বেজে গেল, আবার অরুণ এলো।

তাকে সব কিছু বুঝিয়ে দিল, তার এই সময়ের মধ্যে জাহাজ তেমন কিছু ড্রিফট করেনি।  শান্ত সাগরে ড্রিফট করবেই বা কেন তা ছাড়া তারেক ভালো স্টিয়ারিং করে। নিজের রুমে এসে পোশাক বদলে গোসল দিয়ে চলে গেল সোজা কিচেনের পাশে ডাইনিং রুমে। খেয়ে দেয়ে এসে কিছুক্ষণের জন্য সেলুনে বসল। সাগরের মাঝে কোন টিভি চ্যানেল পাবে না। জাহাজ চলছে, সবাই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত নয়ত ঘুমে। সেলুনে দাবা, তাস বা সময় কাটাবার মত অনেক কিছুই আছে ওগুলি সে কোনটা পছন্দ করে না। কোন রকমে এক বোর্ড খেলেই আর দাবার চাল দিতে পারে না কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যায়। ঘোড়া চালিয়ে দেয় সোজা কিংবা নৌকা চালায় ঘোড়ার মত আড়াই ঘর পাশে আর তাস দেখলেই মাথা ঘুরে।
প্রজেক্টরে একটা সিনেমা চালাল কিন্তু, বেশিক্ষণ বসা যাবে না নাইট নেভিগেশন আছে। চলন্ত জাহাজে ডিউটির সময় ঝিমানোর কোন উপায় নেই। তাড়াতাড়ি ঘুমুতে হবে। বিশ পঁচিশ মিনিট দেখে এসে শুয়ে পরল। কখন যে কি কি সব আজগুবি ভাবনা কোথা থেকে যে উড়ে এসে মাথায় ভিড় করে কে জানে। দিনের ভাবনার মধ্যে অনেকটাই নিরুর দখলে থাকে। তারপর আবার নতুন যোগ হয়েছে লাল পাড় নীল শাড়ি। মনে হচ্ছিল গভীর নীল সাগরের পাশ দিয়ে লাল স্রোতের একটা নদী বয়ে যাচ্ছে। সেই মেয়েটি, যার জন্য শাড়িটি কিনেছে তাকে এই শাড়িটা কি বলে দিবে? আদৌ কি দেয়া হবে তাই ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে।

রাত পৌনে বারোটায় শাহিন এসে ডেকে দিল। জাহাজে এই নিয়ম। পরবর্তী ডিউটির লোকদের ঘুম থেকে ডেকে দেয়া। উঠে চোখ মুখ ধুয়ে ডিউটির পোশাক বদলে হাতে একটা সোয়েটার নিয়ে এলো। রাতের খোলা সাগরে শীত লাগতে পারে। তারেককে নিয়ে এক সাথে ব্রিজে এলো। ওদের দেখে অরুণদা হেসে ইয়ার্কি করে বলল গুড মর্নিং ক্যাপ্টেন নিশাত, ওরা দুই জনেই এক সাথে তার জবাবে বলল
গুড মর্নিং টু ইউ। ওকে স্যার- নাউ ইউ ক্যান গো টু বেড এন্ড হ্যাভ এ গুড ড্রিম।
অরুণদা নিশাতের সিনিয়র কিন্তু হাসি তামাশা ইয়ার্কি ফাজলামি সমানে চলে। তারেক এগিয়ে গেল মিজানের স্টিয়ারিং সিটের পাশে। মিজান চলে গেল তারেক ওর সিটে বসল স্টিয়ারিং হুইল ধরে।
নাও দেখ চার্ট দেখে নাও বলে অরুণদা চার্ট টেবিলের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল ঘণ্টা খানিক পর কোর্স চেঞ্জ করতে হবে।
চার্টে রুট প্ল্যান দেখে নিশাত বলল আচ্ছা ঠিক আছে। কোর্স কত চলছে?
বলেই কম্পাসের দিকে দেখে নিলো।
আচ্ছা ঠিক আছে আপনি যেতে পারেন, নাকি একটু কফি খেয়ে যাবেন?
তুমি যা বল না! এখন যাবো ঘুমাতে আর তুমি বলছ কফি খেতে!
তাতে কি, সব কিছু ঠিক ঠাক থাকলে আপনি ঘুম থেকে উঠে দেখবেন জাহাজ মাস্কাটের আউটারে নোঙ্গর করে আছে। আচ্ছা গ্রে বাহরাইনকে কি আমাদের স্পেন ইটিএ (এস্টিমেটেড টাইম অফ এরাইভ্যাল) জানিয়েছেন?
হ্যাঁ, সে তো বাহরাইন থেকে ছাড়ার সময় বলেছিলাম।
ওরা তো জাহাজ না পৌঁছা পর্যন্ত অস্থির হয়ে থাকে তাই জিজ্ঞেস করলাম, একটা মজার ব্যাপার কি জানেন কাল আমার ডিউটিতে একবারও ডাকেনি।
এখনো আমি ডাকিনি ওরাই ডেকে জিজ্ঞেস করেছিলো।
ইটিএ কত দিয়েছেন?
মাদ্রিদ ফেয়ার ওয়ে বয়া আগামী ১৮তারিখ ভোর সাড়ে পাঁচটা। নাও আর পণ্ডিতি করতে হবে না সময় মতো জাহাজ পৌঁছে দিও। আমি যেন উঠে দেখি জাহাজ নোঙ্গরে। এখন জাহাজ চালাও আর কফি খাও আমি চললাম বলেই ব্রিজ ছেড়ে হাসতে হাসতে বের হয়ে গেল।

নিশাত যথারীতি রাডার, জাহাজের হেড এর পজিশন, কোর্স সহ সব কিছু রুটিন চেক আপ করে ইলেকট্রিক জগে কফির পানি গরম দিল। কালো কফি। কাল কফির পোড়া পোড়া গন্ধটা নিশাতের দারুণ ভালো লাগে। সাথে সামান্য চিনি। মিষ্টি বেশি খায় না, ভালো লাগে না। রাতে চলন্ত জাহাজে ব্রিজের এই ডিউটিতে কালো কফি এক দারুণ জিনিস। কে যে এই কফি আবিষ্কার করেছিলো তাকে পেলে অন্তত একটু ধন্যবাদ জানান উচিত! কফি বানিয়ে এক কাপ তারেকের হাতে দিয়ে নিজে একটা নিয়ে আবার তার প্রিয় সেই স্টার বোর্ড সাইডের সাইড লাইটের স্ক্রিনের উপর বসল। এতক্ষণে ব্যস্ততার জন্য লক্ষ করেনি এখন চোখ পরল সামনের সাগরের দিগন্ত রেখা থেকে জেগে উঠছে বিরাট চাঁদ। চাঁদ থেকে চকচকে একটা রূপালী মেঠো পথের মত এসে পৌঁছেছে ওদের জাহাজের সামনে।
তারেক চাঁদটা দেখেছ?
তাই দেখছি।
কি সুন্দর তাই না?
হ্যাঁ।
ইস আমি যদি এখন এই পথ দিয়ে হেঁটে যেতে পারতাম!
মনে মনে এই পথ বেয়ে চলে গেল অনেক দূরে। হাতের কফির কাপে এখনো একটা চুমুকও দেয়া হয় নি। কফি ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, কাপটা হাতেই ধরা রয়েছে। রাতের এই তারা ভরা খোলা আকাশের নিচে সাগর বুকে চাঁদ থেকে বয়ে আসা এমন পথে কার না একটু হেঁটে বেড়াতে ইচ্ছা করে! নিশাতের কি দোষ? সে তো এমন দায়িত্ব জ্ঞান হীন না। সে যতই ভাবুক না কেন কাজের দিকে তার পুরো খেয়াল। সাগর যতই উত্তাল মাতাল হোক না কেন তার ডিউটির সময় জাহাজ এক আধ মাইলের বেশি ড্রিফট হবে না। লোড আনলোডের সময় তো পাইপ লাইন, পাম্প, প্রত্যেকটা ভাল্ব, জয়েন্ট লিক করছে কি না, টেম্পারেচার ঠিক আছে কি না, পাম্পিং প্রেসার ঠিক আছে কি না, কোন গ্রেডের তেল কোন ট্যাঙ্কে যাচ্ছে, এক ট্যাঙ্কের তেল লিক করে ভিন্ন ট্যাঙ্কে যাচ্ছে কি না সব তার নখ দর্পণে।
এক হাতে কফির কাপ আরেক হাতে টর্চ থাকবেই, তার বয়লার স্যুটের পকেটে আস্ত এক ওয়ার্কশপ। বার বার করে তার চোখ সব কিছুর উপর দিয়ে ঘুরছে। সে নিজে ঘুরছে ডেকের এ মাথা থেকে ও মাথা। কখনো কোন গাফিলতি বা অবহেলা বা অমনোযোগ নেই। সম্পূর্ণ দায়িত্ব সচেতন। তবে খোলা সাগরে ব্রিজে ডিউটির সময় কিংবা অবসর সময় কিংবা বহির্নোঙরে নোঙ্গর করে থাকার সময় যখন ডিউটি করে তখন তার বিস্মিত চোখ অবাক হয়ে বারবার নতুন সব দৃশ্য দেখে নেয় আর ভাবে বিধাতার কি অপূর্ব সৃষ্টি যা নিজ চোখে না দেখলে বোঝা কত কঠিন!

এখন জাহাজ চলছে। এখন কোন অবস্থায় সাগর বুকে চাঁদের বিছান পথে কোন ভাবেই বেড়ানো চলবে না। আবার জাহাজে ফিরে এলোকাপে চুমুক দিয়ে দেখে ঠাণ্ডা বরফ হয়ে গেছে। উঠে এসে আবার পানি গরম দিল, তারেককে জিজ্ঞেস করলো আর এক কাপ চলবে কিনা।
নিশাত ভাই আমি এখন আর না।
আচ্ছা বলে সে নিজে এক কাপ নিয়ে এবার ব্রিজের ভিতরে বসল। বাইরে ঠাণ্ডা লাগছে। বসে তারেকের সাথে নানা বিষয় নিয়ে আলাপ। কখনো নিজ দেশের আবহাওয়া, রাজনীতি, দেশি খাবার, প্রেম ইত্যাদি। হঠাৎ করেই একেক প্রসঙ্গ আসে আবার তা হঠাৎ করেই মিলিয়ে যায়।
দেখলাম কাল তোমার চিঠি এসেছে তা বাড়ির কি খবর?
না নিশাত ভাই তেমন কোন বিশেষ খবর নেই, এই কেমন আছ, আমরা ভালো আছি এই সব যা গতানুগতিক তাই।
হ্যাঁ তাইতো হবে, তুমি আর কি চাও?
কেন এর বাইরে আর কিছু থাকতে পারে না তাই আর কি। আচ্ছা নিশাত ভাই, ফরিদাকে (একটা জাহাজের নাম) একটু ডেকে দেখেন তো পান কিনা, শুনলাম ওরা নাকি মাস্কাটে আছে।
তাই নাকি?
হ্যাঁ, আপনি যখন বাইরে ছিলেন তখন আমি শুনেছি ওরা গ্রে বাহরাইনের সাথে কথা বলছিল।
আচ্ছা দাঁড়াও এখনি ডাকছি।
বলে উঠে এসে রেডিওর রিসিভার হাতে নিয়ে ডাকতে শুরু করলো
ফরিদা ফরিদা দিস ইস প্যাসিফিক ম্যারিনার কলিং
সাগর বুকে ইথার এর মাধ্যমে হাবিবের কণ্ঠে ভেসে এলো ফরিদার জবাব
ইয়েস প্যাসিফিক দিস ইস ফরিদা প্লিজ কাম ডাউন টু চ্যানেল ১৯
চ্যানেল পরিবর্তন করে ১৯ এ এসে আবার ডাকল ফরিদাকে। ওপাশ থেকে এলো হাবিবের কণ্ঠ,
কিরে নিশাত তোদের মাস্কাট ইটিএ আমি জানি তা তোরা কি শিডিউলে আছিস নাকি চেঞ্জ হবে?
না, উই আর ইন শিডিউল!
আচ্ছা তোরা এখান থেকে শুধু ফ্রেশ ওয়াটার নিবি নাকি বাঙ্কারও (জ্বালানি তেল) নিবি?
দুইটাই লাগবে, আজ সী খুবই শান্ত কাজেই আমরা একেবারে কাটায় কাটায় পৌছাতে পারবো, এইতো আর মাত্র ৩৫ মাইল দূরে আছে, মাস্কাটের লাইট দেখা যাচ্ছে। ওদিকে আবার অরুণদা বলে গেছে তাকে যেন সকালে ব্রিজে আসতে না হয় তার আগেই যেন আমি নোঙ্গর করে রাখি। তাছাড়া আমরা যে ইটিএ দেই তা সাধারণত মেইনটেইন করি, আমরা তোদের মত নাকি? মনে নেই ওই যে রাস্তানুরাহ থেকে ইটালি ফেরার পথে কি কাণ্ড করেছিলি?
না রে সে তো হঠাৎ একটা দুর্যোগের কারণেই হয়ে গিয়েছিল।
আচ্ছা শোন, মনির কি ফ্লাই করতে পেরেছে খবর পেয়েছিস?
হ্যাঁ ও এতো দিনে বাংলাদেশে পুরোন হয়ে গেছে।
যাক ভালো হয়েছে, আমার সাথে মানামাতে দেখা হয়েছিল।
হ্যাঁ বলেছে, ওরা যেদিন দুবাই আসছিল সেদিন আমরা কুয়েত থেকে এখানে আসছিলাম তখন আমার সাথে কথা হয়েছে।
তাহলে তোরা এখানে কত দিন যাবত আছিস?
এইতো আজ কয়েক দিন হবে, তোদের ও এখানে দেরি হবে আমাদের পরে তোরা বের হবি কাজেই তোরা সবাই আজ বিকেলে আসবি আমাদের জাহাজে।
সেতো আসব কিন্তু এত দেরি কেন?
এদের ফ্রেশ ওয়াটারে কি যেন সমস্যা তাই
এখানে আয় আলাপ হবে তখন সব জানবি, আসবিতো?
নিশাত আমতা আমতা করছে দেখে হাবিব বলে দিল ভয় করিস না লাইফ জ্যাকেট পরে আসবি আর এক্সট্রা রেফট নিয়ে আসবি।
আচ্ছা ঠিক আছে আসবো। তোরা কোথায় নোঙ্গর করেছিস?
আমরা একটু সাউথে আছি।
আচ্ছা ঠিক আছে তাহলে, আমি তোদের কাছাকাছি এঙ্কর ড্রপ করবো।
হ্যাঁ তাই করিস।
আচ্ছা শোন, তারেক মনে হয় শফিক ভাই এর সাথে কথা বলবে, উনি কি ডিউটিতে?
হ্যাঁ আছে দে ওকে।

নিশাত গিয়ে স্টিয়ারিং ধরে তারেককে কথা বলার জন্য পাঠিয়ে দিল। তারেকের কথা শেষ হলে বলল নিশাত ভাই আপনি আরও একটু থাকেন আমার ক্ষুধা লেগেছে কিছু খেয়ে আসছি।
শোন আমারও ক্ষুধা পাচ্ছে মনে হয় আমার জন্যও কিছু নিয়ে এসো।
কি খাবেন?
তুমি যা খাও তাই নিয়ে এসো।
কিছুক্ষণ পর তারেক গরম দুইটা স্যান্ডউইচ আর এক গ্লাস অরেঞ্জ জুস নিয়ে এসে চার্ট টেবিলে নামিয়ে রেখে বলল
দেন এবার আমার হাতে দেন আপনি খেয়ে নেন।
[চলবে]

No comments:

Post a Comment

Follow by Email

Back to Top