কাল পরীর সমাধি [৭]-পর্ব-২

 [ পূর্ব সূত্রঃ তবে এটুক মনে আছে অনেকেই মরে গিয়েছিল এবং তাদের এনে নদীর কিনারে গর্ত করে মাটি চাপা দিয়েছিল। ও পক্ষের কতজন মরেছিল তা জানা যায়নি। নানা রকম নানা আকারের সিফ, জাকিতকা (তরবারি,
বর্শা), মহিষের শিং বা গিসকা দিয়ে বানান নানা রকমের অস্ত্র এবং আগুনের গোলা আর বিষ মাখা তীর ধনুক কি ভাবে ব্যবহার করতে হয় তখনই ওবি দেখেছিল। তার দাদা তাকে শিখিয়েছিল।]

২।
ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবা থেকে ২৫০ কিমি পশ্চিমে এই আরযো গ্রাম। গ্রাম ঘেঁসে আদ্দিস আবাবা থেকে আসা কাঁচা রাস্তা নিকেমতা এবং গেতেমা হয়ে বেদেলের দিকে চলে গেছে। গ্রামের একেবারে দক্ষিণে দেদেসা নদীর খুব কাছেই ওবির বাড়ি। বুনো ঘাসের ডাটা এবং শণ দিয়ে ছাউনি দেয়া গোলাকৃতির মাটির দেয়ালের বেশ কয়েকটা ঘর। আরামে থাকার জন্য ঘরের চালের নিচে ঘাসের পুরু আস্তর দিয়ে সুন্দর করে ছেয়ে দেয়া। মাটির মেঝে সুন্দর করে লেপা মোছা। এই এলাকায় ঘরের দেয়াল ভিন্ন ভিন্ন ভাবে বানায়। শীত গ্রীষ্ম থেকে রক্ষা পাবার জন্য কোথাও মাটির দেয়ালের ভিতরে ঘাসের আস্তর দিয়ে দেয় আবার কোথাও কাঁচা মাটির ইট বানিয়ে সেই ইট গেঁথে দেয়াল বানায়। এমনি এক ঘরে ওবি এবং তার স্ত্রী রামলা থাকে আর এক ঘরে থাকে ছেলে আবেল। অন্য ঘরগুলিতে ফসল বা সংসারের অন্যান্য প্রয়োজনীয় মালামাল থাকে। আবেল এখন বড় হয়েছে। বিয়ে করে বৌয়ের কাছে চলে যাবে কিন্তু আবেল তার মনোমত পাত্রী খুঁজে পাচ্ছে না। নিয়ম অনুযায়ী নিজেদের গোত্রের মধ্যেই এদের বিয়েশাদী হয় তবে যদি ভিন্ন কোন গোত্রের ছেলে বা মেয়ের কাউকে পছন্দ হয় তাহলে সে ছেলে ওই মেয়ের বাবা মাকে প্রস্তাব পাঠাতে পারে এবং কেরেল বা মিনার (প্রেমিক প্রেমিকা) এর বাবা মা এবং মোড়ল যদি সম্মতি দেয় তাহলে সে বিয়ে হতে পারে। সাধারণত মোড়ল খুঁজে দেখে ওই গোত্রের বা গ্রামের সাথে এদের সম্পর্কটা কেমন। যদি বিগত দুই চার পুরুষের মধ্যে কোন দাঙ্গা হাঙ্গামার ইতিহাস না থাকে তাহলে মোড়ল আপত্তি করে না।
আবেল গতবছর তুলা বীজ বা কাটোনসাদ আনার জন্য গাধার পিঠে বসে বনের সিংহ বা অন্যান্য জীব জন্তুদের এড়িয়ে ঘুরা পথে বেদেল হয়ে আটনাগো গিয়েছিল। ওখানকার তুলা বীজ বেশ ভাল তাই বছরে অন্তত একবার আরযো গ্রামের বাসিন্দারা  তুলা বীজ কেনার জন্য ওখানে যায়। এই এলাকা আবার একটু ভিন্ন রকম। এখানে বুন্না বা কফি চাষ হয় কিন্তু আখের চাষ খুবই কম। বাড়ির ঘরগুলি ঢেউ টিনের ছাউনি দেয়া, মাটির দেয়াল এবং কাঠের দরজা জানালা, মাটির মেঝে। এখানকার গৃহস্থের অবস্থা আরযো গ্রামের চেয়ে ভাল। এখানে বুন্না চাষ হয়। বাইরে বুন্নার দাম বেশি, আখ দিয়ে এলাকার ঘরে ঘরে কালা কাটি বা বিয়ার (হালকা এলকোহলিক পানীয়) তৈরি হয়।
আবেল আটনাগো গ্রামে বুজিবার বাড়িতে গিয়ে যখন পৌঁছল তখন বেলা পড়ে এসেছিল। গত কয়েকদিন ধরে বৃষ্টি হয়নি বলে দিনটা ছিল বেশ গরম। ওই এলাকার রীতি অনুযায়ী বাড়ির যুবতী বড় মেয়েকে অতিথি আপ্যায়ন করতে হয়। আবেল এসে সামনে এক যুবতী মেয়েকে দেখে জানতে চাইল
বুজিবা কোথায়?
বাবা বাড়ি নেই।
তুমি কোথা থেকে এসেছ, কি জন্যে তাকে খুঁজছ?
আমি আরযো থেকে এসেছি, তুলা বীজ নিতে, আমার নাম আবেল।
ও আচ্ছা
বলে বুজিবার মেয়ে মালাইকা জল চৌকির মত একটা টুল পেতে দিল।
তুমি বস আমি আসছি। আবেলকে দেখেই মালাইকার মনে হলো এই সেই পুরুষ যাকে সে এতদিন ধরে খুঁজছে, তাদের এই গায়ে এমন সুপুরুষ আর নেই। যেমন মেদহীন কঠিন চেহারা, তেমনি পেশী, মাথায় ঘন কাল কোঁকড়ান চুল, কুচকুচে কাল গায়ের রঙ দেখতে একেবারে কাটা বাবলার গুড়ির মত। সন্ধ্যা বেলায় এসেছে েখন আবার অত দূরে যাবে কি করে? অতিথিকে আজ এখানে রাতে থাকতে হবে  কাল সকালে যাবে এবং এই ব্যবস্থাই করতে হবে। মালাইকা মনে মনে এমন একটা বুদ্ধি এঁটে ফেলেছে। একটু পরে এক হাতে বুন্নার পেয়ালা আর আর এক হাতে পাতার তৈরি পাখা নিয়ে এলো। মালাইকার মা কালিশা এসে দেখে গেল কে কি জন্যে এসেছে। মালাইকার পরনে জংলা ছাপার পেটিকোট আর গায়েও তেমনি ব্লাউজ কিন্তু এই সামান্য ব্লাউজে টগবগে যৌবন কিছুতেই বাধ মানতে চাইছে না। গলায় এবং হাতে নানা রকমের মালা। মালাইকার চেহারার দিকে তাকিয়ে আবেল থেমে গেল। সাক্ষাত কাল বন পরী। গোলগাল ধরনের ঝিম কাল চেহারার মধ্যে সাদা চোখ আর সাদা দাঁত যেন মুক্তার মত চিকচিক করছে। পুরু ঠোট। স্থানীয় প্রথা অনুযায়ী মাথার চুলে অনেকগুলি চিকন বেণী দিয়ে পিছনে খোপা বাধা, তাতে আবার ছোট ছোট শামুক এবং কড়ির মালা জড়ান। এমন রূপ আবেল জীবনে দেখেনি। গলার মালায় একটা কুমিরের দাঁত আছে। এর মানে হলো সে কোন শক্তির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। রূপের সাথে শক্তি! অবাক হবার মত কথা। এই মেয়ে কি কারো বাগদত্তা? এ কাকে বিয়ে করে সংসার করবে? কি ভাবে সে জানবে এই কথা? কি করে তার মনের কথা একে জানাবে? মুহূর্তের মধ্যেই আবেল ঘামতে শুরু করল। সারাদিনের পথের ক্লান্তিতেও আবেল এতটা ঘামেনি। মালাইকা লক্ষ করে বলল
নাও আতো, বুন্না (কফি) খেয়ে জুরিয়ে নাও তোমাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে
আবেলের হাতে বুন্নার মাটির পেয়ালা ধরিয়ে দিয়ে পাতার পাখা দিয়ে বাতাস করছে। মালাইকাও এমন শক্ত সুঠাম পেশীবহুল পুরুষোচিত চেহারা দেখে সেই থেকেই বারবার দেখছে। এমন পেশী যার তার সাথে নির্ভাবনায় এক সাথে এক চালের নিচে দুইজনে মিলে জীবন কাটিয়ে দেয়া যায়। সন্তানেরাও এমনি হবে। আলাপ করতে হবে। একে হাতছাড়া করা যাবে না। যেমন করেই হোক আটকাতে হবে।
কেমন আছ? পথে কোন অসুবিধা হয়েছে?
না তেমন কোন অসুবিধা হয়নি।
তুমি কি শুধু বীজ নিতেই এসেছ? এর আগে তো তোমাকে কখনও দেখিনি!
আগে বাবাই আসত। হ্যাঁ, বাড়ি থেকে এজন্যেই বেড়িয়েছিলাম কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আরও কিছু নিতে হবে!
আর কি নিবে? আমাদের এখানে শুধু তুলা বীজ ছাড়া আর কিছু নেই!
আবেল ভাবল কেন সুন্দরী তুমি আছ না? তোমার জন্যেই আমি এসেছি।
আচ্ছা ওইজিরিতি, তোমার নাম কি?
আমার নাম মালাইকা।
মালাইকা!
আবেল জানে মালাইকা মানে পরী। তাহলে সে ঠিকই ভেবেছে! তার ভাবনায় কোন ভুল নেই!
বাহ! সুন্দর নাম!
একটু ভেবে মালাইকার দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল
তুমি কি কাওকে কথা দিয়েছ?
এই বয়সের ছেলে মেয়েরা (আতো এবং ওইজিরিতিরা) জানে এই কথা দেয়ার মানে কি।
মালাইকা একটু ভেবে বলল
না
তাহলে আমি তোমাকে প্রস্তাব জানালাম। অযোগ্য মনে না করলে আমার কথাটা ভেবে দেখবে।
প্রস্তাবের কথা শুনেই মালাইকার দেহে মনে প্রাণে একটা আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল। আহ! কি প্রশান্তি! আমিতো এই চাইছি।
আবেল কথাটা বলেই তার বংশের কিছু বীরত্ব গাঁথা শোনাল। আর এই যে দেখ আমার গলায়ও কুমির আর চিতার দাঁতের মালা।
এবার বল বুজিরা কখন আসবে?
বাবার আসতে হবে না, মা তোমাকে বীজ মেপে দিবে কিন্তু সে তো কাল দিবে!
কেন কাল কেন?
সে কি! বুঝতে পারছ না? রাত হয়ে আসছে এই অন্ধকার রাতে অত দূরে যাবে কি করে? রাতে এখানে থাকবে কাল সকালে বীজ নিয়ে যাবে।
আর আমি যে বললাম সে ব্যাপারে তোমার উত্তর কখন জানাবে?
এখনই
তাহলে বল
দেখ তুমি তো ভিন গায়ের ভিন গোত্রের আতো
এই পর্যন্ত বলে একটু থামল।
হ্যাঁ বল তাতে কি হলো?
তুমি বাবা মার কাছে প্রস্তাব নিয়ে আসতে পারবে?
নিশ্চয় পারব
তাহলে এসো।
আবেল মনে মনে ভীষণ খুশি হলো, এতক্ষণ যে ভয়ে ছিল তার কিছুটা দূর হলো। আবার বলছে রাতে এখানে থেকে কাল যেতে। ভালই হবে আরও কিছু বেশি সময় পাবো ওকে দেখতে। রাতের খাবার সময় কি আর কিছু কথা হবে না? শুধু শুধু রাতে থাকার কথা নিষেধ করবে কেন? তবুও একটু লজ্জার ব্যাপার না! থাকতে বলবে আর ওমনিই থাকতে হবে? সে বাড়ি ফিরে যাবে এমন চিন্তা করেই এসেছে।
আবেল বুন্না শেষ করে খালি পেয়ালাটা মালাইকার হাতে দিতে দিতে বলল
না না থাকতে হবে না, আমি আমার গাধা নিয়ে এসেছি ওর সাথেই চলে যেতে পারব।
তা বললেই কি হয়? অন্ধকার রাতে এই পাহাড়ি পথে একা একা এত দূরে যাবার এমন কি দরকার? তোমার কে আছে? দেখেইতো মনে হয় তোমার কোন প্রিয়তমা নেই!
না, কে থাকবে? কেউ থাকলে কি আমার কথা ভেবে দেখার কথা বলতাম তোমাকে? তোমাকে আমার ভীষণ ভাল লেগেছে মালাইকা। মনে হচ্ছে তোমাকে সাথে পেলে আমি জীবনে খুব সুখী হব।
তাহলে আর যেতে চাইছ কেন? থাক, আজ আমি সিগুই এর মাংস রান্না করছি।
তুমি যেভাবে বলছ তাতে আজ আর যেতে পারছি না, এমনিতেও তোমাদের এখানে খুব ভাল লাগছে। বুন্না ক্ষেতগুলা বেশ সুন্দর দেখতে! তবে তুমিই সবচেয়ে বেশি সুন্দর। এখন মনে হচ্ছে আজ এখানে না আসলে মস্ত ভুল হতো আমি তোমাকে পেতাম না।
কি যে বল তুমি! তোমরা বুন্নার চাষ কর না?
না আমাদের ওদিকে কেউ করে না।
মালাইকা, তুমি খুবই সুন্দর!
তুমিও
বলেই মালাইকা লজ্জা পেয়ে খালি পেয়ালা নিয়ে আড়ালে চলে গেল।
আবেল নিজে নিজেই মালাইকার রেখে যাওয়া পাখা দিয়ে বাতাস নিচ্ছে।
[আবেল কি মালাইকাকে তার জীবন সঙ্গী করে পাবে? অপেক্ষা করে দেখি কি হয়!]

No comments:

Post a Comment

Follow by Email

Back to Top