মম চিত্তে নিতি নৃত্যে -[২৭]-১৫

৮।
বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট নির্দিষ্ট সময়ে দুবাই এয়ার পোর্টে ল্যান্ড করল। নিশাত এবং সঙ্গীরা নেমে অন্যান্য যাত্রীদের সাথে ইমিগ্রেশন ডেস্কে এসে নিশাত সবার সিডিসি সংগ্রহ করে সবার সামনে কিউতে দাঁড়াল। এক সময় অফিসারের
ডেস্কের উপর চারটা সিডিসি নামিয়ে দিয়ে পিছনে সবাইকে দেখিয়ে দিল। ইমিগ্রেশন অফিসার সিডিসি খুলে এক এক করে সবার চেহারা দেখে দুবাই এরাইভ্যাল সিল লাগিয়ে ওদের ফেরত দিয়ে দিল। সিডিসি নিয়ে নিশাত একটু এগিয়ে এসে এদিক ওদিক দেখল কিন্তু ফিনলে অফিসের বুড়ো ব্যাপ্টিস্টের কথা মত ওদের এগিয়ে নেবার মত কাউকে দেখতে পেল না। মনে মনে ভাবছে সেই লোক আমাদের চিনবে কি ভাবে বা আমরাই বা ওকে চিনবে কি ভাবে! সবাই এসেছে নিশাতের নেতৃত্বে কাজেই ওর মাথা ব্যথা একটু বেশি। হঠাৎ করেই দেখতে পেল সামনেই কালো পোশাক পরা মোটা এক মহিলা নিশাত জামান এন্ড গ্রুপ লেখা একটা প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে ওদের দিকে আসছে।
নিশাত এগিয়ে গিয়ে বলল আমি নিশাত জামান আর ওই ওরা আমার সাথের।
বেশ বেশ এসো আমার সাথে।
বলে পিছনে ঘুরে দ্রুত হাটতে লাগল।

এত মোটা মানুষ এত দ্রুত হাঁটছে যে ওরা তার সাথে তাল মিলাতে হিম সিম খাচ্ছে। ৪/৫ মিনিট হেঁটে এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে একটু দূরে দাঁড়ান এক লোককে ইশারায় কি যেন বলল। এবার ওদের দিকে ঘুরে বলল তোমাদের মধ্যে হাবিব কে?
এই তো এই হাবিব।
আচ্ছা ঠিক আছে তোমার জাহাজ এখানে আছে আর তোমারা যাবে লন্ডন, তবে এখন না। এখন তোমরা সবাই হোটেলে যাবে ওখান থেকে হাবিব কাল জাহাজে যাবে আর তোমাদের ফ্লাইট কাল রাতে তোমরা কেউ হোটেল থেকে বের হবে না।
মহিলা কথা বলতে বলতেই একটা কাল রঙের বুইক গাড়ি পাশে এসে দাঁড়াল।
নাও গাড়িতে ওঠ।
তুমি যাবে না?
আরে না, আমার এখনো কত কাজ, একটু পরে পাকিস্তান থেকে ফ্লাইটে লোক আসবে ওদের রিসিভ করতে হবে, এই লোক তোমাদের হোটেলে নিয়ে যাবে। গুড নাইট বলে যেমনে এসেছিল অমনিই দৌড়ের মত চলে গেল।

ওরা একে একে গাড়িতে উঠে বসল, মাল পত্র বলতে আর কি, সবার সাথে একটা করে ব্যাগ ছাড়া আর কিছু নেই। বিশ্বের একটা নতুন দরিদ্র দেশের কয়েক জন তরুণ এসেছে নিজেদের ভাগ্য ফেরানোর স্বপ্নে বিভোর হয়ে। বিলাসিতা করার জন্য তো আর আসেনি। কিই বা থাকবে, দুই একটা সার্ট প্যান্ট, লুঙ্গি, গেঞ্জি, গামছা এই তো আর কি। ড্রাইভার সবাইকে দেখে নিয়ে গাড়ি ছেড়ে দিল। জানালার কাচ খোলা ছিল একটু পরেই ওরা দেখল জানালার কাচ একা একাই উঠে বন্ধ হচ্ছে। নিশাত ভাবল সব অটো সিস্টেম। এয়ারপোর্ট এলাকা ছাড়িয়ে বড় রাস্তায় এসেই আস্তে আস্তে গাড়ীর স্পিড বাড়ছে ৫০, ৬০ থেকে একটু একটু করে ১০০ মাইল বেগে ছুটে চলেছে। নিশাত এর আগে বুইক গাড়ির নাম শুনেছে কিন্তু উঠে দেখার বা গাড়িতে চলার সুযোগ হয়নি। জীবনে এই প্রথম এত স্পিডে চলছে। ভয়ে একটু দম বন্ধ হওয়া ভাব। রাস্তার দুই পাশে সোডিয়াম বাতির আলোতে যতটুকু দেখা যাচ্ছে শুধু ধু ধু বালু আর বালুতে গজানো কিছু ছোট ছোট ঝোপ জাতিয় গাছ। যে গাছের ডাল বা পাতা ভাঙলে সাদা কস বের হয় তেমন কিছু ঝোপ ছাড়া আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। রাস্তার মাঝে একটু ফাঁকে ফাঁকে একটা একটা করে লাইট পোস্ট পিছনে চলে যাচ্ছে। সামনে দূরে ডান দিকে লাইন ধরা নানা রঙের বাতির কিছু ঝিলি মিলি দেখা যাচ্ছে। মনে হয় ওটাই শহর এলাকা। গাড়ি উল্কার গতিতে ছুটছে আর ভিতরে বসা কয় জন তরুণ ভাবছে এ কোথায় এলাম, সামনে ভাগ্যে কি আছে, কি হবে, কেমন হবে এই ভাগ্য। সাহস করে কেউ কোন কথা বলছে না চুপ চাপ বসে শুধু ভাবছে। গাড়ি চালাচ্ছে এক আরবি যুবক, তার পরনে সাদা আরবি পোশাক।

প্রায় আধা ঘণ্টা পর লক্ষ করল স্পিড কমিয়ে আনছে। বুঝতে পারলো হয়ত কাছে এসে পরেছি। আর একটু এগিয়ে বাম দিকে একটু ঘুরে একটা বিশাল আলো ঝলমল সুন্দর কারু কাজ করা এক বিশাল দালানের সামনে গেট দিয়ে ঢুকে দেখল বাগানে নানা দেশের পতাকা উড়ছে।  নিয়ন সাইনে লেখা দালানের গায়ে নাম দেখে বুঝল এটা একটা হোটেল। হোটেলের পোর্টিকোর নিচে এসে গাড়ি থেমে গেল। ড্রাইভার ইংরেজিতে বলল তোমরা যার যার মালামাল নিয়ে আমার সাথে চল। সবাই যার যার ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে স্বয়ংক্রিয় দরজা পার হয়ে ভিতরে পা দিতেই একটা সুন্দর নরম সুগন্ধ ওদের স্বাগত জানাল। আহ! ভিতরে কি আরাম! একে বারে ঠাণ্ডায় গা জুড়িয়ে যায় যেন, পায়ের নীচে কার্পেটে পা ফেলতেই মনে হলো পায়ে কোন জুতা নেই। আরবি ড্রাইভারের পিছে পিছে সামনের দিকে এগিয়ে রিসিপশন ডেস্কের পাশে দাঁড়াল সবাই। কাউন্টারে ৩/৪ জন লোক কি কি সব করছিল। ড্রাইভার তাদের এক জনকে ডেকে ওদের দেখিয়ে দিয়ে আরবিতে কি বলল। সুন্দর চেহারার এক লোক ওদের পাসপোর্ট চাইল আর একটা বড় ভারী মোটা খাতা এগিয়ে দিয়ে যার যার নাম পাসপোর্ট নম্বর লিখতে বলল। সবার লেখা হলে নিশাত খাতাটা টেনে নিয়ে নিজের নাম ধাম সব লিখে আবার খাতাটা ওই লোকের দিকে ফিরিয়ে দিল। ড্রাইভার এবার ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গুড নাইট জানিয়ে চলে গেল। কাউন্টারের লোকটা ওদের হাতে একটা একটা করে চাবি ধরিয়ে দিয়ে পাশের লিফট দেখিয়ে সাত তলায় উঠে যেতে বলে দিল। সবাই এক সাথে লিফটে উঠে সাত তলার বোতামে চাপ দিয়ে উপরে উঠে এসে চাবিতে লেখা নম্বর মিলিয়ে যার যার রুম খুঁজে নিলো। সব গুলিই প্রায় পাশা পাশি। যার যার রুমে ঢুকে পরল। নিশাত রুমে ঢুকে কাঁধের ব্যাগটা নামিয়ে রেখে রুমের চারি পাশে ঘুরে ঘুরে দেখে অবাক হলো। এমন সুন্দর রুমে কি থেকেছে কোন দিন? দেখা শেষ হলে কাপড় বদলে বাথ রুমের কাজ সেরে এসে একে একে সবার রুমে গিয়ে সবাই ঠিক ঠাক মত আছে কিনা দেখে আগামী কাল সকালে ঘুম থেকে উঠে ওর রুমে আসতে বলে এলো।

হাবিব জিজ্ঞেস করল আমার কি হবে কিছু বুঝেছিস?
কেন ওই মুটকি বলল না কাল সকালে জানাবে, এখন ঘুমিয়ে পর কাল দেখব কি করে। আমি যাই ভীষণ ঘুম পাচ্ছে।
এয়ারকন্ডিশন রুমে ফিরে এসে নরম ধব ধবে বিছানায় শুয়ে কম্বলটা গায়ে দিয়ে শুয়ে পরল।
প্রায় সবারই সকাল হলো নয়টার দিকে। নিশাত কাল হোটেলের রিসিপশন থেকে দেখে হাতের ঘড়ি মিলিয়ে নিয়েছিল। একে একে সবাই এলো। নিজেরা একটু আলাপ করে নিচে নেমে গেল। নাশতা খাবার কি ব্যবস্থা দেখতে হবে আর কোন ম্যাসেজ আছে কি না তাও জানতে হবে। লিফট বেয়ে নিচে নেমে দেখে, রিসিপশনে কাল যারা ছিল এখন তারা নেই, যারা আছে তাদের এক জনকে জিজ্ঞেস করল
নাশতার কি ব্যবস্থা?
এখনো নাশতা করনি?
না আমরা কাল লেট নাইটে এসেছি এই মাত্র ঘুম থেকে উঠলাম আর তা ছাড়া ব্রেকফাস্ট কোথায় তাও জানি না।
ও আচ্ছা, ওই দিকে দেখ ডাইনিং রুম আছে ওখানে গিয়ে খেয়ে আস।
আচ্ছা আমাদের কোন ম্যাসেজ আছে?
রুম নম্বর প্লিজ
রুম নম্বর বলল
হ্যাঁ তোমাদের হাবিব কে?
এই যে এই হাবিব।
তোমাকে নেয়ার জন্য গাড়ি আসবে সকাল এগার টায় আর তোমাদের বাকি তিন জনের জন্য গাড়ি আসবে সন্ধ্যা সাতটায়। যাও ব্রেকফাস্ট করে এখানে এসো কথা আছে।
নাশতা সেরে ঘণ্টা খানিকের মধ্যে আবার কাউন্টারে এসে দাঁড়াল,
কি বলবে বলেছিলে
ও হ্যাঁ, তোমরা কিন্তু বাইরে যেয়ো না, এখানে লাউঞ্জে বসে টিভি দেখতে পার বা ও পাশে সর্বক্ষণ সিনেমা চলে তাও দেখতে পার কিন্তু বাইরে যাবে না বাইরে গিয়ে হারিয়ে গেলে তোমাদেরও বিপদ আমাদেরও বিপদ।
না না আমরা কেউ বাইরে যাব না, আমরা নতুন এসেছি কিছু চিনি না কোথায় যাব, কাজেই তোমাদের সে ভয় পেতে হবে না।

যা হাবিব তোর ব্যাগ নিয়ে আয় আমরা এখানেই বসি।
ঘড়িতে দেখে সাড়ে দশটা বেজে গেছে, হ্যাঁ আমি আসছি বলে হাবিব উপরে চলে গেল। ওরা নিচেই সুবিধা মত এক জায়গায় বসে পরল। সামনে টিভি চলছে আরবি চ্যানেল, কিচ্ছু বুঝে না। একটু পরেই হাবিব নেমে এলো।
নিশাত আমার ভয় করছে
আরে ধুর! কিসের ভয়? যেখানে যাচ্ছিস ওখানে নিশ্চয় দুই এক জন বাঙ্গালি পাবি, দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। তুই যে এখন চলে যাচ্ছিস তোর সিডিসি নিবি না?
আরে হ্যাঁ, আমি তো ভুলেই গেছিলাম, চল
রিসিপশনে যেয়ে হাবিব রুমের চাবিটা দিয়ে বলল আমি এখন চলে যাব, কি করতে হবে?
হ্যাঁ দাড়াও, সেই সুন্দর বাধান বড় খাতাটা বের করে ওর সই নিয়ে একটা ভাউচারের মত কাগজ বের করে দিল সই করার জন্য, কোম্পানির কাছে বিল পাঠাবে বলে এটা রাখা হলো। ওগুলি রেখে সিডিসি ফেরত দিয়ে দিল।
দেখবি এটা সাবধানে রাখবি কিন্তু
হ্যাঁ মনে থাকবে।
কবিতাকে একটা চিঠি লিখে পাঠাবি
যাঃ কি যে বলিস
আরও কিছু টুকরা আলাপ হলো, একটু পরেই দেখে গেট দিয়ে সেই কালকের ড্রাইভার আসছে।
ওই যে হাবিব তোর সমন এসে গেছে
হাবিব ঘুরে দেখে উঠে দাঁড়াল। ড্রাইভার সাথে যাবার ইশারা করে বেরিয়ে গেল। হাবিবের সাথে সবাই বের হয়ে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিল। গাড়ি ছেড়ে যাবার আগে জানালায় মুখ রেখে নিশাত আবার বলে দিল ভয় বা চিন্তা কিছু করবি না। দেখলি তো কি ভাবে সব হচ্ছে।
হাবিবকে নিয়ে গাড়ি হোটেলের সীমানা থেকে বের হয়ে যাওয়া পর্যন্ত ওরা গেটে পোর্টিকোর নিচে রইল। মেইন গেট থেকে বের হয়ে গেলে আবার এসে যেখানে বসে ছিল সেখানে বসে টিভি দেখছে। বিরক্তিকর চ্যানেল। ভালো লাগছে না,
চলেন ভাই একটু হাটা হাটি করি আর নয়ত দেখি ওখানে কি সিনেমা চলছে।
চলেন।

কিছু করার নেই। কোন কাজ নেই। নিশাত ও পাশে সিনেমার সামনে বসে ভাবছে আর চারিদিকে দেখছে। এই যে এত বড় ফাইভ স্টার হোটেলে কি আর নিজের টাকায় থাকতে পারতাম কোন দিন? কত রকমের মানুষ আসছে যাচ্ছে। কেউ সুদৃশ্য বিশাল লাউঞ্জে বসে টিভি দেখছে নয়তো বই পড়ছে, কেউ রিসিপশনের কাউন্টারে হেলান দিয়ে সঙ্গীর সাথে কথা বলছে। তার পরেও সবার মধ্যে একটা চাপা ব্যস্ততা। বিভিন্ন ভাষায় কথা বলছে, বিভিন্ন জাতীর লোক জন। বিচিত্র গুঞ্জন তার মধ্যে আবার অদৃশ্য স্পীকারে মৃদু স্বরে মিউজিক বাজছে যেন একটা ভিন্ন জগতে এসে পরেছে। তার চির চেনা জগত এটা নয়। রাতারাতি এক ভিন্ন গ্রহে চলে এসেছে। মানিয়ে নিতে হবে এই পরিবেশ। নিজের পয়সায় এই হোটেলের গেটের ভিতরেই ঢুকতে পারত না। সে সাধারণ একজন নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান বাবা সাধারণ এক জন সরকারী কর্মচারী। কোম্পানির জোড়ে আজ এই ভিন্ন গ্রহে বসে ভাবতে পারছে। একটু আগে যে নাশতা করে এসেছে তা কি কখনো খেয়েছে? দেশে ঢাকায় এমন সোনার গাও হোটেল, ইন্টার কন্টিনেন্টাল হোটেল রাস্তা দিয়ে যেতে আসতেই শুধু দেখেছে, কখনো ভিতরে ঢুকতে পারেনি। তবুও মনে হচ্ছে দেশের ওই সব হোটেল এর কাছে কিছুই নয়। ওর চেয়ে এর সৌন্দর্য অনেক বেশি। নিশ্চয়ই এই দুবাইতে এমন আরও অনেক হোটেল আছে হয়ত এর চেয়েও দামী। কোম্পানি কি আর তাদের অত বেশি দামী হোটেলে রাখছে? নিশ্চয় এর চেয়ে অনেক দামী হোটেল আছে। সেখানে কারা থাকে, কত টাকা থাকলে অমন হোটেলে থাকা যায়? নিশ্চয় আর যারা আছে তাদের সবাই ওর মত কোম্পানির টাকায় থাকছে না। হঠাৎ করেই নিশাতের মনে এক প্রশ্ন এলো, আচ্ছা যদি কোম্পানি বলে এই হোটেলে থাকার খরচ তার বেতন থেকে কেটে রাখবে, তা হলে কি উপায় হবে? ওকে বিক্রি করলেও তো এই ভাড়া দেয়া সম্ভব না। তা হলে কি হবে? কত কি সাত পাঁচ ভাবছে মাথা মুণ্ডু কিছু ঠিক নেই। অজানা অচেনা একেকটা নিত্য নতুন ভাবনা মনে আসছে যাচ্ছে। এমন সময় ওদের সাথে যে কুক সে এসে বলল
ভাই এখানে একা একা কি করছেন চলেন ওখানে ভালো একটা হিন্দি সিনেমা হচ্ছে দেখি
চলেন দেখা যায়, এ ছাড়া আর কিই বা করবো।
[চলবে]

No comments:

Post a Comment

Follow by Email

Back to Top